Amar Sangbad
ঢাকা বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬,

কূটনীতিকদের পদচারণা রহস্যের বেড়াজালে আটকা

মার্চ ৫, ২০১৫, ০২:৫৯ পিএম


কূটনীতিকদের পদচারণা রহস্যের বেড়াজালে আটকা

 

দেশের চলমান সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কূটনীতিকদের পদচারণা চোখে পড়ার মতো। বিএনপির সাথে কূটনীতিকদের সাক্ষাতের ফলাফল রহস্যের বেড়াজালে আটকা পড়েছে।

 গত ২ মাসে অনেক বৈঠক হয়েছে বিএনপির সাথে। তবে এর ফলাফলকি তা আদৌ স্পষ্ট নয় দেশের মানুষের কাছে। তাদের বৈঠকে দেশের কোন ক্ষতি হল না উপকার হলো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না বিশেষ্টজনেরা। কূটনীতিকদের মনোভাব জানতে ব্যর্থ হয়েছেন সাংবাদিক এবং সুশিল সমাজ।

গত বছরের  ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে যেই তারিখটি অবিস্বরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট ২০ দলীয় জোট সে নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগ সংবিধান রক্ষা করার জন্য সে নির্বাচন করেছে বলে আওয়ামী লীগের দাবি। তবে সে কথা মানতে নারাজ বিএনপি। নির্বাচনের পর থেকে ১ বছর নিরব থাকলেও গত বছরের ৫ জানুয়ারি গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্র্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে চায় বিএনপি। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিএনপিকে অুনমতি দেয়নি ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশ। পরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার গুলশান কার্যালয়ে দাড়িঁয়ে অনির্দিষ্ট কালের অবরোধের ডাক দেয়। পরেই শুরু হয় সারা দেশে জ্বালাও  পোড়াও। বন্ধ হয়ে হয়ে যায় গাড়ি চলাচল। কিছু চললেও তাতে ককটেল নিক্ষেপ এবং আগুন দেয়ার মত ঘটনা ঘটলে আতংক বিরাজ করে জনমনে।

 তবে বর্তমানে তা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। তার পরই  দেশের  যে রাজনৈতিক সংকট শুরু হয় তা মিমাংসা করতে কূটনীতিকদের আনাগুনা  বেড়ে যায়। চতুর্দিক থেকে সংলাপের প্রস্তাব যায় আওয়ামী লীগের কাছে কিন্তু সংলাপের কোন প্রয়োজন নাই বলে সাফ জানিয়ে  দেন আওয়ামী লীগ। সে প্রস্তাবে অংশ নেন দেশ এবং দেশের বাহিরের প্রভাবশালী মহল। তার মধ্যে বেশি অংশগ্রহণ করেছেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।

৫ জানুয়ারির পর থেকেই রাজনৈতিক পাড়ায় বেড়ে যায় কূটনীতিকদের পদচারণ। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে। গত দুমাসের মধ্যে বিদেশিরা সম্ভবত সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল বৈঠক করেন গত মঙ্গলবার। বৈঠকটি করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে।  সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টার দিকে গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট। রাষ্ট্রদূত বিএনপির সাথে রাত সাড়ে ৮ টা পর্যন্ত বৈঠক করেন। তার সাথে ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতসহ আরও কয়েকজন কূটনীতিক।

বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বৈঠক নিয়ে কিছু বলা যাবে না উল্লেখ করে সাংবাদিকদের তিনি জানান, বিদেশিদের বক্তব্যই আমাদের বক্তব্য। বিদেশিদের বক্তব্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়, তারা আগেও বাংলাদেশের এরকম অবস্থা দেখেছেন। তারা হরতাল ও সহিংসতা বন্ধের দাবি জানান। অস্ট্রেলিয়ান রাষ্ট্র্রদূত গ্রেগ উইলকক বলেন, আমাদের অবস্থান আগের মতোই। বিএনপির সাথে এটাই প্রথম কূটনৈতিক বৈঠক নয় বরং এর শুরুটা হয় রহস্যময় ফোন আলাপের মধ্য দিয়ে। যা গত ৭ জানুয়ারি বুধবার রাতে সূত্রপাত হয়।

আদৌকি অমিত শাহা ফোন করে ছিলেন কিনা এনিয়ে শুরু হয় তিব্র আলোচনা সমলোচনা। পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আব্দুল মঈন খানের গুলশানের বাসায় সুইডেন, নরওয়ে, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, ডেনমার্ক, স্পেন ও অস্ট্রোলিয়ার রাষ্ট্রদূত এবং ইউরোপী ইউনিয়ন-এর আবাসিক প্রতিনিধি ও কানাডার হাইকমিশনারের পলিটিক্যাল কাউন্সিলরদের সাথে একটি বড় বৈঠক হয়।

 এতে মঈন খানসহ বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মাহবুবুর রহমান। তবে ওই  বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছে তা প্রকাশ করেনি কোন পক্ষই। ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসনের সাথে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম জিয়া। গুলশান কার্যালয়ের দোতলায় অনুষ্ঠিতব্য ওই বৈঠকে বেগম জিয়া ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না। যদিও অন্য সময়ে এসব বৈঠকে খালেদা জিয়ার সাথে কয়েকজন উপদেষ্টা উপস্থিত থাকেন।

গত ৩ জানুয়ারি থেকে গুলশানের কার্যালয়ের প্রধান ফটক ৩৯ দিন বন্ধ থাকলেও গিবসনের উপস্থিতে প্রধান ফটক খুলে যায় বাধঁহীনভাবে। গিবসন সাংবাদিকদের জানান, কোকোর সমবেদনা জানাতে এসে ছিলেন তিনি। মুত্যু ১৭ দিন পরে সমবেদনা জানাতে আসাটা রহস্যময় হলেও অবশ্য কোন প্রশ্নের বেকায়দায় পড়তে হয় নি তাকে। ১৫ ফেব্রুয়ারি গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশ করেন তুরস্কের রাষ্ট্রদূত হুসেইন মোফতুগলু।

 বিএনপি সূত্রে জানা যায়, এটি ছিল সৌজন সাক্ষাৎ। তবে এই রাষ্ট্রদূত কি নিয়ে আলাপ হল এব্যাপারে কিছু না বলেই দ্রুত গতিতে গাড়িতে উঠে পড়েন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশ করেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপ কমিটির (ড্রোই) প্রতিনিধিদল।

ইউরোপের প্রতিনিধিরা প্রবেশ করা মাত্রই তাদের হাতে চলে যায় বিএনপির গুম-খুনের শিকার হওয়া নেতাদের একটি তালিকা। বিচারপ্রার্থী হয় বিএনপি। তালিকা হাতে পেলেও তা কী করবেন তা বুঝে উঠা কঠিন হয়ে ছিল বিদেশি কূটনীতিদের। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, তালিকাটা বিদেশিদের হাতে ধরিয়ে বিএনপি কি বিচার চাইলো? নাকি ওই নামগুলোর বিনিময়ে 'একটা কিছু' পাওয়া যায় কিনা সেটা বাজিয়ে দেখলো? কাজকর্মে যতই 'ফরমালিটি' থাকুক, রাজনীতি আর কূটনীতিতে বাংলাদেশ তার বিদেশি বন্ধুদের কাছে অনেকটাই 'ইনফরমাল'।

 এটাও ঠিক যে, মানুষ সচরাচর নিজের ঘর-বাড়িতেই 'ইনফরমাল' থাকতে পছন্দ করে। তো বিদেশি বন্ধুরা কি বাংলাদেশকে অমনটাই ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন? দিন যত যাচ্ছে ততই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে একটার পর একটা। বৈঠক চলছে কূটনীতিকদের সাথে কিন্তু এর পরিনতি কি? বা কূটনীতিকরাই  বিএনপির সাথে কি আলাপ করছে তা যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে এসব বিষয় নিয়ে রহস্য। এর শেষ কোথায়?

অন্যদিকে দেশের চলমান পরিস্থিতি বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কাছে চিঠি দেয় জাতি সংঘের মহাসচিব বানকি মুন। বানকি মুনের চিঠির জবাবে বিএনপি চেয়ারপরসন জানান, সংকট নিরসনে সংলাপে বসতে জাতিসংঘের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে চিঠিতে। সংকট নিরসনে সংলাপে বসার পাশাপাশি এ ব্যাপারে সরকারের নেতিবাচক মনোভাব ও মন্তব্যের কথাও তুলে ধরা হয়েছে, ওই চিঠির জবাবে।

এতো  বৈঠক আলাপ আলোচনার শেষ ফলাফল কি তা আজও বুঝতে পারছে না দেশের সাধারণ মানুষ। মানুষ আশায় বুক বাধেঁ আবার সে আশা ভেঙ্গে যায়। এভাবেই চলে গেল দুই মাস। খেটে খাওয়া এসমস্ত মানুষ হতাশায় এখন দিশেহারা পরিবার পরিজন নিয়ে পড়েছেন বিপাকে ।