|
লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার : অনিয়মই যেখানে নিয়ম
সাইফুল ইসলাম স্বপন, লক্ষ্মীপুর, আমারসংবাদ.কম, ২১ নভেম্বর-১১ :
অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, সিট বাণিজ্য ও মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার। কারাগারের ভেতরে ব্যবহার হচ্ছে মোবাইল ফোন। চলছে হাজতী কেনাবেচা। কারাগারের হাসপাতালের ভর্তি হয়ে থাকছে সুস্থ্য হাজতি। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এবং হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের নিয়ন্ত্রণে চলে কারাগারের আইন কানুন। ক্যান্টিনের নামে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। এ সকল অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা এখন সেখানে রীতিমতো নিয়মে পরিণত হয়েছে। আর এ যাঁতাকলে কিংবা অনিয়মের বলি হতে হয় সাধারণ হাজতিদের। বলতে গেলে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার। অনিয়ম এবং অবৈধ ব্যবসা বন্ধে কারা কর্তৃপক্ষের নেই কোন প্রদক্ষেপ। অভিযোগ রয়েছে জেল সুপার এসব অবৈধ কাজে তার অংশ নিয়ে অপরাধীদের সহযোগিতা করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার এখন মাদকের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। সব ধরণের মাদক বেচা-বিক্রি হয় হয় এ কারাগারের ভেতরে। গাঁজা থেকে শুরু করে ফেন্সিডিল, বিয়ার এবং ইয়াবা পাওয়া যাচ্ছে সহজে। মাদক ব্যবস্যা নিয়ন্ত্রণ করে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদী এবং আটককৃত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা। কারাগারের ভেতরে রমরমা মাদক ব্যবসা করে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা কামিয়ে নিচ্ছে এ সকল সন্ত্রাসীরা। পিছিয়ে নেই সাধারণ মাদক ব্যবসায়ীরাও। মাকদের মামলায় যে সকল মাদক ব্যাবসায়ী জেলের ভেতরে আছে তারাও নেমে পড়ে মাদক ব্যবসায়। এখাসে বসে সাজাপ্রাপ্ত আসামী লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের টেন্ডার নিজেদের আত্মীয় স্বজনের নামে ভাগিয়ে নিচ্ছেন।
মোবাইল ফোন ব্যবহার : কারাগারের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার এখন ওপেন সিক্রেট। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এবং সাজপ্রাপ্ত আসামীরা খুব সহজেই ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন। কারাগারের ভেতর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সন্ত্রাসীরা তাদের আন্ডার গাউন্ডের খবরা খবর এবং বিভিন্ন ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ করছে। অবাধে চলচ্ছে চাঁদাবাজি কারাগারের ভেতর থেকে ব্যাবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা ও অনুগত লোকজন টাকা নিয়ে আসে। এ টাকার ভাগ জেল সুপার পায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আসামী কেনাবেচা : বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামীরা বিক্রি হওয়ার মাধ্যমে জেলখানায় প্রবেশ করে। প্রথমে তারা আদালতের হাজতখানায় বিক্রি হয় জেলা খানা থেকে আসা কারারক্ষীদের কাছে। প্রতিটি আসামী গড়ে ১০০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়। কারারক্ষীরা প্রত্যেক হাজতিদেরকে ওয়ার্ডের কয়েদিদের কাছে ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি করে দেয়। কয়েদি ও রাইটার তাদের কাছ থেকে আদায় করে এক হাজার থেকে পাচঁ হাজার টাকা। হাজতির যদি আর্থিক অবস্থা ভালো হয় তার কাছ থেকে আদায় করা হয় দশ- পনের হাজার টাকা। এ জন্য প্রত্যেক হাজতিকে প্রথম দিন ঘুমাতে হয় টয়লেটের পাশে। আবার অনেককে টয়লেটে দাড়িয়ে কাটাতে হয়। হাজতিরা এ টাকা না দিলে তাদের ওপর করা হয় শারিরিক ও মানসিক র্নিযাতন। হাজতিরা তাদের আত্মীয়স্বজন দেখা করতে আসলে টাকা নিয়ে কয়েদি ও রাইটারের চাহিদা মত টাকা দেয়।
ম্যাট ও রাইটারদের দৌঁরাত্ম :
কারাগারের ভেতরে নিজেদের তৈরি মনগড়া আইন-কানুনের কর্তা থাকে ম্যাট ও রাইটাররা। রাইটারের মধ্যে আবার সিনিয়র রাইটারও আছে। সাধারণ হাজতিদের কয়েকটা গ্র“পে ভাগ করা হয়। আর এক একটি গ্র“পের নিয়ন্ত্রণে থাকে ম্যাট ও রাইটার নামে ভয়াভহ সন্ত্রাসীরা। এতে তাদের লাভ- কারাগারে সাধারণ হাজতিদের কাছে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে যথ অর্থ কিংবা খাবার আসবে তার নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাড ও রাইটাররা। হাজতীর সাথে আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাতকে বলা হয় ‘দেখা’। এ ‘দেখা’ আসলে রাইটাররা বিভিন্ন উপায়ে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ‘দেখা’র কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়।
এছাড়া হাজতিদের কাছে বাহির খেকে অর্থ পাঠালে তার প্রায় অর্ধেক চলে যায় এ ম্যাড ও রাইটার নামের সন্ত্রাসী কিংবা খুনিদের কাছে। একদিকে যেমন সাধারণ হাজতিরা তাদের পরিবারের কাছ থেকে একটু সুবিধায় থাকার জন্য অর্থ নিচ্ছে, অন্যদিকে কারাগারের ভেতরের খুনি সন্ত্রাসীরা তা নিয়ন্ত্রণ করে হাজতিদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে তাদের পরিবারের কাছে পাঠাচ্ছে। কোন হাজতি অর্থ দিতে অপরগতা প্রকাশ করলে তাদের জন্য আছে শাস্তির ব্যবস্থা। বিভিন্ন কঠিন কাজ কিংবা সাধারণ সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় তাকে।
সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে একজন ম্যাড কিংবা রাইটার ৪০ থেকে ৫০হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন হাজতিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়। এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর কারাগারের সুপার নুরশেদ আহম্মেদ ভূইঁয়া জানান দেশের ৮-১০ টা জেলখানা থেকে লক্ষ্মীপুর জেলখানা অনেক ভালো আছে। তিনি জেল খানায় মোবাইল ব্যাবহার ও মাদক বিক্রির সাথে তার সম্পৃক্ততা এড়িয়ে বলেন এখানকার বন্দিরা ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।
|