ভূতের চেয়েও মানুষ বেশি ভয়ঙ্কর

ছোরি মুভি রিভিউ

chhorii

বলিউড গতানুগতিকভাবে বিভিন্ন জনরার সিনেমা নির্মাণে মুন্সিয়ানা দেখিয়ে এলেও, হরর ঘরানার ছবিতে তেমন ভিন্নতার স্বাদ পাওয়া যেত না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই একই মাপের কাহিনী, পুরোটা জুড়ে যৌনতা ও অশ্লীলতা, খাপছাড়া গল্প, বাজে পরিচালনা ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত বলিউডের হরর জনরা হাতেগোনা কয়েকটা সিনেমা বাদে মনে রাখার মতো কিছু উপহার দিতে পারেনি। প্রায় সময়ই হরর সিনেমার মোড়কে উপহার দেয়া হয়েছে বস্তাপচা কন্টেন্ট, যা নিয়ে সমালোচনার কোনো অন্ত ছিল না।

২০১৮ সালে মুক্তি প্রাপ্ত দুই সিনেমা 'পরী' ও 'তুম্বাড়' একশো আশি ডিগ্রি পাল্টে দিয়েছিল বলিউডের হরর ঘরানার চিরাচরিত চিত্রপট। পরী সিনেমার টিজার বের হবার পরই অনেকে আন্দাজ করতে পেরেছিল, এ ছবির গল্প অতিপ্রাকৃত রূপকথার আদলে আর দশটা হরর মুভির মতো সাজানো নয়। নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে, নতুনত্বের স্বাদ পেতে যাচ্ছে সিনেপ্রেমীরা। এবং সত্যিই তাই ঘটেছিল। এরপর আবার হরর মুভিপ্রেমীদের দীর্ঘ অপেক্ষা। কিন্তু সবুরকা ফল মিঠাই হল। সদ্য মুক্তি পাওয়া ইমরান হাশমির ডেবুক দেখে যখন হতাশ দর্শক সেই সময় আশা জাগালো ছোরি। 

আপনি যদি দুর্বলচিত্তের মানুষ হয়ে থাকেন তাহলে ছোরি দেখার সাহস না করাই ভালো। আর যদি খুব ইচ্ছে করে তাহলে আপনার পুরো পরিবারকে নিয়ে দেখতে পারেন। বলে রাখা ভালো এইটা একটা ফ্যামিলি মুভি। 

আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা সাক্ষীর সুখী দাম্পত্য হেমন্তের সঙ্গে। ব্যবসার জন্য ধার নিয়ে টাকা শোধ করতে না পারায় হুমকি দেওয়া হয় হেমন্তকে। পাওনাদারদের থেকে বাঁচতে ড্রাইভারের কথায় নিরিবিলি জন মানুষহীন এক জায়গায় গা ঢাকা দেয় সাক্ষী-হেমন্ত। পাওনাদারদের টাকা জোগাড় হলেই ফিরে যাওয়াই তাদের প্ল্যান। কিন্তু এমনই এক অদ্ভুত গ্রাম যেখানে রাস্তা খুঁজে বের করা গুগল ম্যাপেরও যেন সাধ্য নেই। 

ড্রাইভারের ছোট ভাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেয় সাক্ষী আর হেমন্ত। সেখানে তাদের সেবা যত্ন করে ড্রাইভারের স্ত্রী ভান্নো দেবী। 

জন মানুষহীন এই গ্রামে মানিয়ে নিতেও কষ্ট হয় সাক্ষীর। এই গ্রামে এখনও সেই পুরনো রীতি চলে। স্বামীর খাবারের পরেই স্ত্রী খেতে পাবে। স্বামীর নাম ধরে ডাকাটাও এদের কাছে পাপ। কিন্তু উপায় নেই, জীবন বাঁচাতে হলে এখানে থাকতেই হবে। এরমাঝে টাকা জোগাড় করতে হেমন্ত শহরে যায়। এরপর থেকেই শুরু হয় সাক্ষীর সাথে কিছু অদ্ভুত সমস্যা। ৩ টা বাচ্চাকে দেখতে পায় সাক্ষী। কিন্তু তাদের সাথে কথা বলতে গেলেই তারা পালিয়ে যায়। সাক্ষী বার বার চেষ্টা করেও তাদের ধরতে পারে না। 

কিন্তু ভান্নো দেবী তাকে বার বার নিষেধ করে ওই বাচ্চাগুলোর কাছে না যেতে। এই নিয়ে ওদের দুইজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। ভান্নো দেবীর আচরণ কেমন যেন সন্দেহজনক মনে হয় সাক্ষীর। ভান্নো দেবীর ছেলের বউকে দেখে সন্দেহ আরও তীব্র হয়। হেমন্ত যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন সে হেমন্তকে বলে এখানে কোনো ঝামেলা আছে, এখানে সে আর থাকবে না। হেমন্ত সাক্ষির কথা মেনে নিয়ে পালাতে যায় কিন্তু ড্রাইভার হেমন্তকে আঘাত করে। আর সাক্ষীকে অজ্ঞান করে বেঁধে রাখে। সাক্ষী শোনায় এই বাড়ির অদ্ভুত এক ভুতুড়ে ঘটনা।  

তবে  ড্রাইভার আর ভান্নো দেবী কি চায় সাক্ষী আর হেমন্তের কাছে? আর এই বাড়ির ভূতুড়ে রহস্যই বা কী? সাক্ষী আর হেমন্তের শেষ পরিণতিই বা কী?  

এইসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে অ্যামাজন প্রাইমের নতুন সিনেমা ছোরিতে।  পরিচালক বিশাল ফুরিয়ার পরিচালনায় এই সিনেমায় মুখ্য ভুমিকায় অভিনয় করেছেন নুসরাত ভারুচা, মিতা বশিষ্ঠ, রাজেশ জয়সে ও সৌরভ গোয়েল।  

কোনও বাড়তি জ্ঞানের বাণী না আউড়ে এই ছবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কন্যা ভ্রুণ হত্যার নৃশংস দিক। হরর মুভি বলতে যা বোঝায় এই ছবি খাপে খাপ না। বরং ফাঁকা ভয় দেখানোর থেকে এই ছবির বিষয়বস্তু এমন যে দর্শকের গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসবে, গলা শুকিয়ে যাবে। 

এক জ্বলন্ত সামাজিক বিষয়কেই ছবির ফ্রেমে ধরার চেষ্টা করেছেন পরিচালক বিশাল ফুরিয়া । ছোরি সিনেমার পরতে পরতে দর্শকদের জন্য রয়েছে সারপ্রাইজ। হাতে গোনা কয়েকটি চরিত্র এবং নির্জন বসতি এই ছবির হরর ফ্যাক্টরকে আরও খানিকটা বাড়িয়ে দেয়। 

এই ছবির মেঠো প্রেক্ষাপট ছবিটিকে যেন আরও বেশি করে বাস্তব করে তুলেছে। দুর্ধর্ষ ক্যামেরার কাজ ছোরি ছবির বাড়তি পাওনা। ক্যামেরার দুরন্ত কারসাজি ভয়ে বাতাবরণ বাড়িয়ে দেয়। ছবিতে এমন বেশ কয়েকটি দৃশ্য রয়েছে যা একই সঙ্গে আপনাকে ভীষণ রাগিয়ে দেবে আবার মনের কোণে কোথাও না কোথাও দারুণ যন্ত্রণা অনুভব করবেন। 

একটি দৃশ্যের কথা না বলে পারছি না। গ্রামের মধ্যে শুকিয়ে যাওয়া একটি কুয়োর মধ্যে মৃত শিশুদের দেহের স্তূপের দৃশ্য দেখে আপনার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে যাবে।

ছোরি কেবল একটি হরর মুভি নয়, এইটি সমাজের মাঝে লুকিয়ে থাকা ভয়ঙ্কর সত্যের গল্প। যা মনে করিয়ে দেয় ভূতের চেয়েও মানুষ বেশি ভয়ঙ্কর। 

বহুদিন পর একটি দারুণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন দুঁদে অভিনেত্রী মিতা বশিষ্ঠ। বহু বছর পর ছোরি ছবিটি তার মতো প্রতিভাবান অভিনেত্রীকে লাইমলাইটে নিয়ে এল। ভান্নো দেবীর চরিত্রে মারকাটারি পারফর্মেন্স মিতা বশিষ্ঠের।

অন্তঃসত্ত্বা সাক্ষীর চরিত্রে সত্যিই ভালো করেছেন নুসরাত ভারুচা। ছক ভাঙে চরিত্রে অভিনয়ের চ্যালেঞ্জে তিনি ভালো নম্বর নিয়েই পাশ করলেন। হেমন্তের চরিত্রে সৌরভ গোয়েলও যথাযথ। মরাঠি ছবি লাপাচ্ছাপির দারুন হিন্দি রিমেক করেছেন পরিচালক বিশাল ফুরিয়া।

তবে সর্বাঙ্গ সুন্দর নয় এই ছবিও। রয়েছে কিছু গলদ। হেমন্তের চরিত্রটি আরও একটু যত্ন নিয়ে স্কেচ করা যেত। ড্রাইভারের চরিত্রে অভিনয় করে রাজেশ জয়সের জন্যও আরও একটু স্ক্রিনটাইম বরাদ্দ করা যেতেই পারত। তবে সব মিলিয়ে এই ছবি নিঃসন্দেহে দেখার মতো। 

আমারসংবাদ/এডি