ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত

রায়হান উদ্দিন তন্ময় প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২২, ০৩:০৭ এএম

রাজধানীতে চলছে মেট্রোরেল নির্মাণকাজ। পাশাপাশি হচ্ছে সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ স্যুয়ারেজের কাজ। উত্তরা থেকে আগারগাঁও মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষের দিকে। তবে মিরপুর-১২ থেকে শেওড়াপাড়া পর্যন্ত টার্মিনাল নির্মাণ এলাকার ব্যবসায়ীদের  মাথায় হাত।

কারণ ক্রেতার অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে শতাধিক দোকানপাট। ক্ষতির মুখে আরও বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আবার ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ মিরপুর এলাকার বাসিন্দারা। হালকা কিংবা ভারী বৃষ্টিতে জমছে পানি। সবমিলিয়ে বাসা ছেড়েছেন অনেক বাসিন্দা। ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না এসব এলাকার বাড়িওয়ালারা। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের অভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের। দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানান ছোট-বড় ব্যবসায়ীসহ বাড়িওয়ালারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জমিওয়ালা বা বাড়িওয়ালা নয়, এর বাইরে যারা ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছেন তাদেরও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা প্রকল্প পরিচালক বরাবর আবেদন করতে পারেন। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন মেয়রকেও বিষয়টি জানাতে পারেন। 

গত রোববার সরিজমিন ঘুরে দেখা যায়, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১০, ১১, ১২ এলাকায় মেট্রোরেল নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। তবে এসব এলাকায় চলছে টার্মিনাল নির্মাণকাজ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলায় কমেছে ক্রেতার সংখ্যা। ফলে টামির্নাল এলাকাগুলোতে এশিয়ান, আকতার, সোয়ান, গোল্ডেন ট্রেক, ইউরো এশিয়াসহ অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি ফার্নিসার্সের দোকান বন্ধ রয়েছে।

সুপারশপ, ওষুধের দোকান, মুদি দোকানসহ আরও অর্ধশতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক দোকানি দোকান ছাড়তে চান। আবার ধুলোবালি আর যানজটের কারণে বাসা ছেড়েছেন অনেক বাসিন্দা। প্রতি মাসে দু-তিনটি ফ্ল্যাট থাকছে খালি। বাসা ভাড়া কমিয়েও ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না বাড়িওয়ালারা। বাড়িওয়ালাসহ ছোট-বড় ব্যবসায়ীদের প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তারা।

ব্যবসায়ীরা জানান, ক্রেতা না থাকায় প্রতিমাসে হচ্ছে লোকসান। বাড়িওয়ালারা দোকান ভাড়া কম নিতে চান না। তাই বাধ্য হয়ে দোকান ছেড়েছেন অনেকে। এছাড়াও উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় অনেক জায়গায় একপাশ দিয়েই চলছে যানবাহন। ধুলায় সৃষ্টি ঘোর অন্ধকারে সড়কে যানবাহন চলাচলও থমকে যায়। এতে বিপাকে পড়ছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও অফিসগামী মানুষ।

সরেজমিন ঘুরে আরও দেখা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১৪নং ওয়ার্ড। শেওড়াপাড়া, পূর্ব ও পশ্চিম সেনপাড়া, পূর্ব ও পশ্চিম কাজীপাড়া, পূর্ব ও পশ্চিম কাফরুল নিয়ে ওয়ার্ডটি গঠিত। একই সঙ্গে মিরপুর ও কাফরুল থানার অন্তর্ভুক্ত এটি। ১৪নং ওয়ার্ডের উত্তরে মিরপুর ১০নং গোলচত্বর, দক্ষিণ-পশ্চিম কাফরুল, পূর্বে ইব্রাহিমপুর, পশ্চিমে রয়েছে পীরেরবাগ।

এই এলাকায় গার্মেন্টস কারখানা, বিপণিবিতান, কলকারখানাসহ রয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। এ এলাকায় মেট্রোরেলের পাশাপাশি চলছে রাস্তা-ঘাট সংস্কার ও নির্মাণের কাজ। একদিকে সড়ক খুঁড়ছে অন্যদিকে খোঁড়াখুঁড়ির সমাপ্তি হয়েছে। খোঁড়া মাটি রাস্তার ওপর ও পাশে রাখা হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও বালুর স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

ফলে যানবাহন চলাচল কিংবা পথচারীর হাঁটাহাঁটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে মাটি। মাটি ও বালু বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। ফলে বায়ুদূষণে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।

কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকার আল মদিনা দোকানের মালিক মো. মিজানুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, গত চার বছর ধরে লোকসান গুনে যাচ্ছি। দোকান ভাড়া ১৫ হাজার ও কারেন্ট বিল প্রায় ২৫০০ টাকা। বেচাবিক্রি না থাকায় গ্রামের বাড়ির জমি ১১ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি ও দেনা পরিশোধ করেছি। কাজ শেষ হওয়ার আশায় থাকতে থাকতে এ পর্যন্ত আমার প্রায় ২৯ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। আয় রোজগার না থাকায় পরিবারের সাথেও সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দোকানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাড়িওয়ালা চুক্তি করতে চাচ্ছে না। কারণ সিটি কর্পোরেশন বাড়ি ভেঙে ফেলবে। বাড়িওয়ালা ক্ষতিপূরণ পাবে কিন্তু আমার ক্ষতি পূরণের কী হবে? এমন ক্ষতির কথা আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী প্রতিবেদককে জানান।

শেওড়াপাড়া এলাকার বাড়িওয়ালা ইউসুফ খান আমার সংবাদকে বলেন, মেট্রোরেলের কাজ চলমান থাকায় যানজট বেশি থাকে। তাই ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি মাসেই দু-তিনটি ফ্ল্যাট খালি থাকে। বাসা ভাড়া কমিয়ে দেয়ার পরও ভাড়াটিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত কাজ শেষ হলে সবকিছু  স্বাভাবিক হবে।

আরাফাত ফার্নিসার্সের মালিক মো. আকতার হোসেন বলেন, রাস্তার ধুলা-বালির কারণে বেচা-কেনা কম এবং মাঝে মাঝে দোকান বন্ধ রাখতে হয়। মনে হচ্ছে দোকান ছেড়ে দিতে হবে। আর লোকসান গুনতে পারছি না। ব্যবসায় তো পুরাই লালবাতি জ্বলে গেছে। কাজীপাড়ায় ব্যবসা করেন সজল। তিনি বলেন, রাস্তাঘাটের সংস্কারে কারণে জলবদ্ধতার সমস্যা তো আছেই।

এছাড়া ধুলা-বালির সমস্যার বিষয়ে কি আর বলব বলেন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ১৪নং ওয়ার্ড কমিশনার মো. হুমায়ুন রশীদ জনির সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়।

নগরপরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, যেকোনো প্রজেক্ট করার সময় কী কী ক্ষতি হয় তার তালিকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত। সাধারণত আমাদের দেশে শুধু জমির ক্ষতির ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। তবে সব ধরনের ক্ষতিপূরণ দেয়া উচিত। বাড়িওয়ালার বাড়ি ভাঙার কারণে বাড়িওয়ালা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে অথচ ব্যবসায়ী পাবে না। তা হতে পারে না।

কারণ ব্যবসায়ী তো এতদিন অপেক্ষায় ছিল মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শেষ হলে আবারও ব্যবসা করতে পারবে। যে বাড়িতে দোকান ছিল তা যখন ভাঙা পড়ছে তাতে তার বহু ক্ষতি হচ্ছে। তাই এমন যারা ক্ষতিগ্রস্ত আছেন তারা প্রকল্প পরিচালক বরাবর আবেদন করতে পারেন। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের মেয়রকেও বিষয়টি জানিয়ে রাখতে পারেন। সরকারের উচিত এমন ক্ষতিগ্রস্তদেরও ক্ষতিপূরণ দেয়া।  

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন অঞ্চল-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, মেট্রোরেলের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলে মানুষের ভোগান্তি কিছুটা কমে যাবে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত এটা ঠিক। কাজ শেষ হলে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে। এখন ধুলাবালি কমে গেছে। তারপরও নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে।