আইএমএফের সতর্কবার্তা

অর্থনীতিতে তিন চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৩, ১১:৪০ পিএম
  • সংস্কারে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় পাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
  • সুদহার, ডলার রেট ও রিজার্ভ গণনার সুরাহা মুদ্রানীতিতে
  • সংস্কারের চূড়ান্ত যাচাইয়ে অক্টোবরে ফের আসবে আইএমএফ মিশন

দশের অর্থনীতিতে তিনটি চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে সংস্থাটির পর্যালোচনায় এ অঞ্চলের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনকারীদের অন্যতম বাংলাদেশ। অন্যদিকে ঋণের শর্ত অনুযায়ী কতিপয় সংস্কারের জন্য আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে আগামী জুলাইয়ের মুদ্রানীতিতেই সুদহার, ডলার রেট ও রিজার্ভ গণনার বিষয়ে সুরাহা হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র। জানা গেছে, সংস্কার কার্যক্রম চূড়ান্ত যাচাইয়ে বছরের শেষ দিকে ফের আসবে আইএমএফ মিশন।

আইএমএফ থেকে বাংলাদেশের ঋণ সহায়তা শর্ত হিসেবে সংস্থাটির সাথে যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন চলমান আছে। এর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করতে গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশে অবস্থান করেছে আইএমএফের স্টাফ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল। গতকাল সফর শেষে প্রতিনিধি দলের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংক সাংবাদিকদের আলোচনার সারকথা জানিয়েছে। গণমাধ্যমে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছে আইএমএফ এবং প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক।

সফরের পরিসমাপ্তিতে আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান রাহুল আনন্দ তার লিখিত বক্তব্যে বলেছে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখেও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে যারা দ্রুত হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। তবে সামনে বাংলাদেশের জন্য তিনটি চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ তিনটি হলো— ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক আর্থিক খাতের অস্থিরতা বৃদ্ধি পাওয়া ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি। আইএমএফ মনে করছে, এসব কারণে দেশের প্রবৃদ্ধি, বিদেশি মুদ্রার মজুত ও স্থানীয় মুদ্রা টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। বিবৃতিতে রাহুল আনন্দ আরও বলেছেন, ‘এই সফরে আমরা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক খাতের সামপ্রতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি। আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচির মূল যেসব প্রতিশ্রুতি ছিল, সেগুলো কতটা পূরণ হলো, তার অগ্রগতিও পর্যালোচনা করেছি। বর্ধিত ঋণ সুবিধা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সুবিধা (ইএফএফ), রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ) ব্যবস্থার প্রথম পর্যালোচনায় আনুষ্ঠানিকভাবে তা মূল্যায়ন করা হবে, যা এ বছরের শেষের দিকে হবে বলে আশা করা হচ্ছে।’ সফরের সময় আইএমএফের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, অর্থসচিব ফাতিমা ইয়াসমিন এবং অন্য ঊর্ধ্বতন সরকারি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। এ ছাড়া তারা বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, দ্বিপক্ষীয় দাতা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।

অন্যদিকে গতকাল আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে শেষ দিনের আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী মুদ্রানীতিতে ইন্টারেস্ট রেট করিডর বা বাজারভিত্তিক সুদহার চালুর বিষয়ে ঘোষণা দেবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে মুদ্রার একক বিনিময় হার চালুর দিকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রিজার্ভের হিসাব পদ্ধতির সুরাহার কথাও তুলে ধরেন মুখপাত্র। একক বিনিময় হার চালুর বিষয়টি ব্যাখ্যা করে মেজবাউল হক বলেন, মুদ্রার একক বিনিময় হার মানে এই নয় যে, ডলারের ক্রয় ও বিক্রয়ের হার একই হবে। এখন একাধিক বিনিময় হার আছে, তবে সেগুলোর মধ্যকার ব্যবধান ২ শতাংশের মধ্যে এলেই বলা যাবে মুদ্রার একক বিনিময় হার আছে। সেটা প্রায় অর্জিত হয়ে গেছে। তবে তা আরও বেশি সীমার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া আইএমএফের ব্যালেন্স অব পেমেন্টস এবং ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬) অনুযায়ী রিজার্ভ গণনার বিষয়েও আগামী মুদ্রানীতিতে ঘোষণা দেয়া হবে। তিনি জানান, আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল আগামী অক্টোবরে বাংলাদেশ সফরে আসবে। বাংলাদেশকে দেয়া ঋণের শর্তানুযায়ী যেসব সংস্কার কার্যক্রম চালানোর কথা, সেগুলোর কিছু বিষয় সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্জিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে বাংলাদেশের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইএমএফ কী বলেছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মেজবাউল হক বলেন, ‘আমরা জানি, আইএমএফ এসব যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ে সন্তুষ্ট, যদিও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সময় আছে, সেগুলো আমলে নিয়ে আমরা সম্পূর্ণ সন্তুষ্টি নিয়ে কাজ করতে পারব।’ চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মেজবাউল হক বলেন, ‘সেটা তো আপনারা জানেন, রিজার্ভ গণনা নিয়ে একটা ইস্যু আছে।’ বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত হিসাব করে, আইএমএফ তাতে পরিবর্তন চায়। তাদের পরামর্শ হলো, প্রকৃত রিজার্ভের তথ্য প্রকাশ করা হোক। মেজবাউল হক আরও বলেন, চলমান সফরে প্রধানমন্ত্রী যেসব দেশে গেছেন, তারা সবাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সেগুলো আসতে শুরু করলে দেশের ‘ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট’ আরও শক্তিশালী হবে। অনুমোদন করা ঋণের প্রথম কিস্তির অর্থ আইএমএফ এরই মধ্যে ছাড় করেছে। সংস্থার সদ্য সমাপ্ত মিশনের বা প্রতিনিধিদলের সফরের সঙ্গে ঋণের দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ প্রাপ্তির সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন মেজবাউল হক।

আইএমএফ বাংলাদেশকে যে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ দিয়েছে, তার শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী জুলাইয়ের মধ্যে একটি সুদহার করিডর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সুদহার করিডর এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সুদহারের বেঁধে দেয়া সীমা ধীরে ধীরে তুলে নেয়া ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহারে পরিচালনভিত্তিক পরিবর্তন করা যায়। গত মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভার পরে বলা হয়েছিল, ব্যাংক ঋণের সুদহার নির্ধারণ হবে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে। ট্রেজারি বিলের সুদহারের সঙ্গে অতিরিক্ত ৩ শতাংশ পর্যন্ত যোগ করা যাবে। তবে ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার কত হবে, বাংলাদেশ ব্যাংক তা প্রতি মাসে নির্ধারণ করে ঘোষণা করবে। এ হার ঠিক করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক তার নির্ধারিত সূত্র অনুসরণ করবে। নতুন এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে আগামী জুলাই মাস থেকে। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘শর্টটার্ম মান্থলি এভারেজ রেট’ বা স্মার্ট। তবে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি ভোক্তা ঋণে সর্বোচ্চ সুদহার কত হবে, তা-ও নির্ধারণ করে দেয়া হবে। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে আইএমএফ। ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬২ লাখ ডলার হাতে পেয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের মুখে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আইএমএফের কাছে ঋণের আবেদন করে বাংলাদেশ। ঋণ চুক্তির সময় বাংলাদেশ বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের শর্তে সম্মতি দিয়েছিল। এর প্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোসহ আর্থিক খাতের কাঠামো ও নীতি সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে বাংলাদেশ। ২০২৬ সাল পর্যন্ত আইএমএফের কর্মসূচি চালু থাকার কথা রয়েছে।