গ্রাহকের অভিযোগ
মো. তোফায়েল আহমেদ। বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলার শালিখা গ্রামের একটি কওমি মাদ্রাসায় পাঁচ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। মসজিদের ইমামতি থেকে পান আরও তিন হাজার। কোনোমতে টেনে-টুনে চালাচ্ছেন সংসার। প্রতিবেশী মো. আনারুল ইসলাম ভালো বেতনে ইমামতির চাকরি পাইয়ে দেয়ার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ কিছু কাগজপত্র নেন। চাকরি তো হয়ইনি বরং কিছুদিন পর জানতে পারেন তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ভালুকায় চেক জালিয়াতির মামলা হয়েছে। মামলা থেকে রেহাই পেতে দিতে হবে আট লাখ টাকা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় তোফায়েল প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। একই সঙ্গে প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। দুটি মামলার খরচ জোগাতে তার এখন বেহাল অবস্থা।
দৈনিক আমার সংবাদের হাতে আসা মামলার নথিপত্র ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার গুজিয়াম এলাকার বাসিন্দা মফিজুল ইসলামের নামে ইস্যুকৃত ডাচ-বাংলা ব্যাংকের দুটি চেক ডিজঅনার হয়েছে। মফিজুল ব্যাংকটির একটি এজেন্ট আউটলেটের প্রপাইটর। টাকার পরিমাণ ১৭ লাখ ৪৬ হাজার। ২৮১১৫২০০০১৯৯২ নং হিসাবের যথাক্রমে চেক নং ৬৭৮৯১৬২-এ আট লাখ ও ৬৭৮৯১৬৪ নং চেকে ৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। হিসাবধারী ব্যক্তির নাম তোফায়েল আহমেদ। তিনি বগুড়ার সোনাতলা এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় ময়মনসিংহের ৮নং আমলি আদালতে ন্যাগশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট আইনের ১৩৮ ধারায় একটি মামলা হয়েছে (নং-৯/২৩)। আদালতের ওয়ারেন্ট আদেশ পেয়ে আসামি তোফায়েল আহমেদ আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। এরপর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপককে একটি আইনি নোটিস পাঠান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি অভিযোগ দেন। এতে তোফায়েল দাবি করেন তার অগোচরে প্রতারণার উদ্দেশ্যে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ভালুকা সিডস্টোর শাখায় হিসাবটি খোলা হয়েছে। তিনি কখনোই ময়মনসিংহে যাননি। তার বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী মফিজুল ইসলামের সাথে কখনোই কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ হয়নি।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। চাইলেই কেউ জালিয়াতি করতে পারে না। ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশ ছাড়া অন্যজনের এনআইডি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা সম্ভব নয়। আমার সংবাদের কাছে ভুক্তভোগী তোফায়েল দাবি করেন, নিজস্ব সোর্স ব্যবহার করে তিনি হিসাবের নথিপত্র ব্যাংকের সার্ভার থেকে দেখেছেন। তাতে এনআইডির সাথে ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষরে গরমিল রয়েছে। ব্যাংক হিসাবে ব্যবহূত মোবাইল নাম্বারটিও তার নয়। ব্যাংক হিসাবে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তাও তোফায়েলের নয়। শুধু নাম ঠিকানা তার। এতে তোফায়েল নিশ্চিত হয়েছেন, প্রতিবেশী আনারুল ইমামতির চাকরির কথা বলে তার কাছ থেকে নেয়া এনআইডি অথবা জন্মনিবন্ধনের তথ্য ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশে হিসাবটি খোলেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর মফিজুল (তোফায়েলের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী) ও প্রতিবেশী আনারুলের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ৮নং আমলি আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নং-৫২৭/২০২৩) তোফায়েল।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ও তোফায়েলের বিরুদ্ধে করা চেক ডিজওনারের মামলার বাদী মফিজুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, ‘অ্যাকাউন্টের তথ্য ব্যবহার করে আমি মামলা করেছি। তোফায়েল নামের ব্যক্তির সাথেই আমি নিয়মিত লেনদেন করতাম। তিনি স্থানীয় প্রাণ কোম্পানির ডিলার ছিলেন। ওই ব্যক্তির আসল নাম আনারুল কি-না তা আমি জানি না। স্থানীয় সব মানুষ তাকে তোফায়েল নামেই চিনে। আমার কাছ থেকে টাকা নেয়ার পর হঠাৎ সে গা ঢাকা দেয়। মাদ্রাসা শিক্ষক তোফায়েল সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।’ তিনি বলেন, জালিয়াতির মাধ্যমে যদি হিসাব খোলাও হয়ে থাকে তাও আমি কিছু জানি না। কারণ এই হিসাবটি আমার এজেন্ট আউলেটে খোলা হয়নি। ব্যাংক হিসাবটি (২৮১১৫২০০০১৯৯২) সিডস্টোর শাখায় খোলা হয়েছে।
অভিযু্ক্ত আনারুল আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমি এসবের কিছু জানি না। আমি কিছুদিন ভালুকায় চাকরি করেছি সেই সুবাদে ডাচ্-বাংলার এজেন্ট মফিজুলকে চিনি। আমার ধারণা মফিজুলই হিসাবটি খুলে থাকতে পারে। কিন্তু তোফায়েলের কাগজপত্র মফিজুল কিভাবে পেল সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই।’ ইমামতির চাকরি দেয়ার কথা বলে তোফায়েলের কাগজপত্র নেয়ার কথা তিনি অস্বীকার করেন। আট লাখ টাকা দিলে মামলা তুলে নেয়ার কথাও নাকচ করেন তিনি। তবে আনারুল স্বীকার করেন তার জানামতে, তোফায়েল ময়মনসিংহে যায়নি সে বগুড়াতেই থাকে।
গ্রাহকের অনুপস্থিতিতে এনআইডি, ছবি ও স্বাক্ষর ছাড়াই কিভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে জানতে চাইলে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ভালুকা সিডস্টোর বাজার শাখা ম্যানেজার কামরুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, ‘লিগ্যাল নোটিস পাওয়ার পর নোটিস দাতার কাছে কিছু কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে। কাগজপত্র পেলে যাচাই করে দেখা হবে।’ এনআইডি ছাড়া হিসাব খোলা হয়েছে কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণত এসব নথিপত্র ছাড়া অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকলে এমন ঘটনা সম্ভব। বিষয়টি প্রধান কার্যালয়ের তদন্তের অধীন থাকায় এর বেশি বলা সম্ভব নয়। পরে এ বিষয়ে জানতে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গেলে বিষয়টি নিয়ে তথ্য দিতে কালক্ষেপণ করেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। এক মাসের অধিক সময় অপেক্ষা করেও তথ্য না পেয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কাশেম শিরিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি মুঠোফোনে সাড়া দেননি। গতকাল রাত ৮টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লিখিত প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দেননি এমডি।
প্রসঙ্গত, করোনাকালীন সময়ে সরাসরি লেনদেন হয় না ব্যাংকের এমন কার্যালয়গুলোতে সর্বসাধারণের প্রবেশ বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এর সুযোগ নিয়ে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশও নিয়ন্ত্রণ করছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকে সাংবাদিক প্রবেশের আগে সাক্ষাৎদানকারী কর্মকর্তার নাম রেজিস্ট্রার করতে হয়। যা স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থি। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকও এ ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি পালন করে আসছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে গ্রাহকের এনআইডি, ছবি ও স্বাক্ষর ছাড়া হিসাব খোলা খুবই কঠিন। একজনের তথ্য দিয়ে অন্য কেউ হিসাব খোলা প্রায় অসম্ভব। সাধারণভাবে বুঝা যাচ্ছে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার যোগসাজশেই এমন ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে বিষয়টি বেরিয়ে আসবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক আমার সংবাদকে বলেন, ‘তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় অন্য কারো তথ্য ব্যবহার করে হিসাব খোলা হয়েছে, তাহলে ব্যাংককে এর দায় নিতে হবে। তখন জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হবে। ব্যাংকই তখন ব্যবস্থা নিবে।’