তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে মাউশির ওয়েবসাইট তৈরির নির্দেশনা

খরচের ব্যয়ভার শিক্ষার্থীর ঘাড়েই

বেলাল হোসেন ও মেহেদী হাসান মাসুদ প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৩, ১১:৪৮ পিএম

ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে সরকার এখন স্মার্ট যুগে প্রবেশ করেছে। তবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি দক্ষ জনবল এখনো সেভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ওয়েসবাইট নির্মাণ কিংবা হালনাগাদ সম্পর্কে ধারণাই নেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের। হালনাগাদে নেই নিজস্ব দক্ষ কোনো জনবলও। দেয়া হয়নি কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ। অনলাইন কাজে পরনির্ভরতা কাটেনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের। এখনো শতভাগ তথ্য আদান-প্রদানে ব্যবহার হয় না ডিজিটাল মাধ্যম। অথচ এক মাসের কম সময় দিয়ে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ওয়েবসাইট করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়। যাদের ওয়েবসাইট রয়েছে, তাদের করতে হবে হালনাগাদ। এরই মধ্যে দেয়া হয়েছে নির্দেশনা। 

তবে প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা বলছেন,  অতীতেও একাধিকবার নির্দেশনা পেয়ে কিছু প্রতিষ্ঠানপ্রধান ওয়েবসাইট নির্মাণ করেছেন, যা মেয়াদোত্তীর্ণ বা অস্তিত্ববিহীন। পূর্বের নির্দেশনায় ওয়েবসাইট নির্মাণে ধারণা না থাকায় কারো ১০ হাজার, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানপ্রধান ব্যয় করেছেন ৩০ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানে তথ্য আপলোড অথবা আপডেট করার বিষয়ে কেউই অবগত নন; ফলে এ ধরনের কাজ সফল করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং সুদির্নিষ্ট নীতিমালা করা প্রয়োজন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাজেটের সমস্যা না হলেও অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট তৈরিতে যে টাকা ব্যয় হবে, তা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বিভিন্ন খাত থেকে টাকা নেয়া হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন অভিভাবকরা। সারা দেশে যদিও স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান এর ব্যয় নির্বাহ করবে, তবুও সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে প্রায় ২০ কোটি টাকা অপচয় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর শিক্ষাবিদরা বলছেন, ঢালাওভাবে নির্দেশনা দিয়ে লাভ নেই। সক্ষমতা যাচাই করে পর্যায়ক্রমে তৈরি করলে ভালো হবে। আর ওয়েবসাইট তৈরির যে ব্যয়ভার, তা এসে পড়বে শিক্ষার্থীর ঘাড়েই!

গত ১৯ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর  (মাউশি) ওয়েবসাইট তৈরি-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট নেই এবং অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থাকলেও করা হয় না হালনাগাদ। প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠান পরিচিতি, পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি, শ্রেণি ও লিঙ্গভিত্তিক শিক্ষার্থীর তথ্য, শ্রেণিভিত্তিক অনুমোদিত শাখার তথ্য, পাঠদান-সংক্রান্ত তথ্য (রুটিন পাঠ্যসূচি, বিবিধ নোটিস ইত্যাদি), এমপিও ও জাতীয়করণের তথ্য (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), প্রতিষ্ঠানের টেলিফোন বা মুঠোফোন নম্বরসহ যোগাযোগের ঠিকানা, প্রতিষ্ঠানপ্রধানসহ সব শিক্ষক-কর্মচারীর তথ্য, ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য হালনাগাদ রাখতে হবে।
বগুড়া, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, খুলনা এবং সিলেটের প্রায় ৩০ প্রতিষ্ঠানপ্রধানের সঙ্গে কথা বলেছে আমার সংবাদ। 

এদের মধ্যে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে দ্বিধার মধ্যে; আবার কেউ এ সম্পর্কে কোনো নির্দেশনার খবরই জানেন না। অথচ আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি বা হালনাগাদকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের ওয়েব ঠিকানা মাউশি অধিদপ্তরের ঊগওঝ-এর ওগঝ মডিউলে .িবসরং.মড়া.নফ দেয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে। তড়িঘড়ি এমন সিদ্ধান্ত অতীতেও হয়েছে। কিন্তু কোনো সফলতা আসেনি বরং অপচয় হয়েছে। রাজবাড়ীর নলিয়া শ্যামামোহন ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান মিয়া বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ওয়েবসাইট করার নির্দেশনা পাওয়া গেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করছি কীভাবে এটা করা যায় এবং কত টাকা লাগবে। প্রতিষ্ঠানে তেমন দক্ষ লোক না থাকায় দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছি। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া থানার হাটসাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, স্কুলের ওয়েবসাইট তৈরির নির্দেশনা বিষয়ে তারা জানেন না। এ ব্যাপারে কোনো চিঠি তারা পাননি বলে জানান। 

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ইএমআইএস সেলের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট খন্দকার আজিজুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, সারা দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল-কলেজের ওয়েবসাইট তৈরি এবং  হালনাগাদের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের পর আমরা বিষয়টি নিয়ে আবার ফলোআপ করব। স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট থাকার বিষয়ে এটা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট তৈরিতে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। সারা দেশে আইসিটি শিক্ষকের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে সরকারের এ কর্মকর্তা বলেন, একজন শিক্ষক তার অর্পিত দায়িত্বের বাইরে ওয়েবসাইট পরিচালনা নিয়ে তেমন গুরুত্ব দেন না। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে চৌধুরী আমার সংবাদকে জানান,  সরকার সারা দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল-কলেজগুলোয় যে ওয়েবসাইট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, তার জন্য সাধুবাদ জানাতে হয়। তবে সারা দেশের প্রায় ২২ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট তৈরি, এটাকে পরিচালনা করার স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল, হাইব্রিড ইন্টারনেট সংযোগ ইত্যাদির সক্ষমতা আছে কি না, তা দেখতে হবে। যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে এটা তো হোঁচট খাবেই। আমরা কী সারা দেশে কানেক্টিভিটি তৈরি করতে পেরেছি? পারিনি। উদাহরণ টেনে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ভিকারুননিসা স্কুলের সঙ্গে তো অষ্টগ্রাম হাইস্কুলের বিষয় মেলালে হবে না। তাদের অবস্থান, সক্ষমতা সব দেখতে হবে। 

তিনি বলেন, শুধু ওয়েবসাইট তৈরি করলেই তো হবে না, এটা হালনাগাদও করতে হয়। এর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে কি না, তাও দেখতে হবে। আবার এগুলো পরিচালনার একটা ব্যয় আছে, তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আছে কি না— এসব দিক বিবেচনা করে ওয়েবসাইট তৈরির নির্দেশনা দিতে হবে। ঢালাওভাবে দিয়ে তো লাভ নেই। পর্যায়ক্রমে করলে ভালো হতো। ওয়েবসাইট তৈরির যে ব্যয়ভার, এক পর্যায়ে দেখা যাবে এটা শিক্ষার্থীর ঘাড়েই এসে পড়বে। সব দিক বিবেচনা করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে; তা না হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।