বছর তো শেষ হয়েই এলো। আর মাত্র এক দিন পরই বিদায় জানাতে হবে ২০২৩ সালকে। এ বছরটাকে আসলে ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কী বলবেন! বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে গত বছর সব আলো কেড়ে নিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। সে বছর বিশ্বকাপ জিতে সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন এই মহাতারকা। এ বছরও কম কীসে, জিতেছেন নিজের ক্যারিয়ারের অষ্টম ব্যালন ডি’অর। ইউরোপ অধ্যায় শেষ করেছেন চলতি বছরেই। তবুও তার বাঁ পায়ের ধার কমেনি এতটুকুও। ক্যারিয়ারের সিংহভাগ সময়ই বার্সোলোনার জার্সিতে কাটিয়েছেন লিওনেল মেসি।
তবে ২০২১ সালে ক্লাবটির সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হয় তার। স্প্যানিশ জায়ান্টদের সঙ্গে দীর্ঘ ২০ বছরের সম্পর্ক চুকিয়ে ভালোবাসার শহর প্যারিসে পাড়ি দেন তিনি। সেখানে দুই মৌসুম কাটিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলকে বিদায় বলেন আর্জেন্টাইন লিটল ম্যাজিশিয়ান। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে সব জল্পনা-কল্পনা গুঁড়িয়ে আমেরিকায় পাড়ি দেন মেসি। সেখানে মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে নিজের নাম লেখান লিও। সকার লিগে পাড়ি দেয়ার মধ্য দিয়ে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক ছেদ করেন এ আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। এখন তিনি বেশ ভালোই আছেন ক্লাবটিতে।
শুধু আমেরিকা নয়, এ বছর ফুটবলের বিপ্লব ঘটিয়েছে সৌদি আরব। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে দিয়েই সৌদি আরবের ফুটবল বিপ্লব শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের। আর সেখানেই ফুটবল বিপ্লব! বিষয়টি বিস্ময়কর হলেও এ বছরটা সৌদির জন্য ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা বয়ে এনেছে। গত বছরের শেষ মুহূর্তে সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল নাসরে পাড়ি দিয়ে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন পর্তুগিজ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সে সময় ভাবা হয়েছিল, সৌদিতে পাড়ি দেয়া একমাত্র তারকা ফুটবলার হয়তো তিনিই। কিন্তু চলতি বছর দেশটিতে রীতিমতো ফুটবল বিপ্লব ঘটেছে। বছরজুড়েই ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব দাপিয়ে বেড়ানো বড় তারকারা সৌদিতে পাড়ি দেয়া শুরু করেন। এ তালিকায় সবচেয়ে বড় নাম নেইমার জুনিয়র, করিম বেনজেমা, সাদিও মানে, এনগোলো কান্তে, রবার্তো ফিরমিনো, রিয়াদ মাহরেজ ও ইয়াসিন বুনোর মতো তারকারা।
ক্লাবজগতে পুরো বছর রাজত্ব করেছে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি। গত মৌসুমজুড়েই দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে ম্যানচেস্টার সিটি। তবুও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে কিছুটা হলেও স্নায়ুচাপে ভুগছিল সিটিজেনরা। অন্যদিকে ইন্টার খেলেছে নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে। তাতে ম্যাচটা হয়ে উঠেছিল অনেক বেশি টেকটিক্যাল। স্প্যানিশ কোচ পেপ গার্দিওলার হাত ধরে শেষ হাসিটা হেসেছে সিটিজেনরাই। আর তাতে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা উঁচিয়ে ধরে প্রিমিয়ার লিগের চ্যাম্পিয়নরা। এর আগে প্রিমিয়ার লিগ ও এফএ কাপও জিতেছিল তারা। একই মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে দ্বিতীয় ইংলিশ ক্লাব হিসেবে ট্রেবল জয়ের কীর্তি গড়ে ক্লাবটি। এরপর ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপাও জিতে নেয় ম্যানচেস্টার সিটি।
এ বছর নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার যৌথ আয়োজনে পর্দা উঠেছিল নারী ফুটবল বিশ্বকাপের। যেখানে উড়তে থাকা ইংল্যান্ডের মেয়েদের মাটিতে নামায় স্পেন। এর মধ্য দিয়ে নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরে স্প্যানিশ মেয়েরা। ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট সিডনিতে ফিফা নারী বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। ম্যাচের ২৯ মিনিটে অলগা কারামোনার গোলে এগিয়ে যায় স্পেন, সেই গোলই তাদের এনে দিল প্রত্যাশিত শিরোপা। চলতি বছরের জুনে ইংল্যান্ডের ওভালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে ২০৯ রানে হারায় অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্য দিয়ে নিউজিল্যান্ডের পর টেস্টের শ্রেষ্ঠত্বের রাজদণ্ড হাতে ওঠে প্যাট কামিন্সের দলের। সে সঙ্গে প্রথম দল হিসেবে আইসিসির সবগুলো ট্রফি জেতার নজিরও গড়ে অজিরা। ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপ আসরের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ভারতকে ছয় উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্য দিয়ে রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তোলে অজিরা।
গত ১৯ নভেম্বর আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে ভারতকে ছয় উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় অস্ট্রেলিয়া। টস হেরে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২৪১ রান করে স্বাগতিকরা। জবাবে ৪২ বল হাতে রেখে জয়ের বন্দরে নোঙর করে অজিরা। ২০২৩ সালে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় ইভেন্ট ছিল আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ। এবারের আসরটি গড়িয়েছিল ভারতের মাটিতে। এর মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো উপমহাদেশের মাটিতে পর্দা উঠেছিল বিশ্বক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরের। ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস, শ্রীলঙ্কার জায়গা হলেও ছিটকে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে খেই হারিয়ে বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার যোগ্যতা হারায় ক্যারিবীয়রা। ফলে এই প্রথম দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ছাড়াই মাঠে গড়ায় ভারত বিশ্বকাপ। ইতিহাস গড়ে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে আফ্রিকার দেশ উগান্ডা। নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৪ সালের টি-২০ বিশ্বকাপে অংশ নেবে দলটি। উগান্ডা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিলেও ব্যর্থ হয়েছে জিম্বাবুয়ে। আফ্রিকান অঞ্চলের বাছাইপর্বের পয়েন্ট টেবিলে দ্বিতীয় স্থানে থেকে শেষ করেছে উগান্ডা। ছয় ম্যাচে পাঁচ জয়ে ১০ পয়েন্ট পেয়েছে তারা। শীর্ষে থাকা নামিবিয়ারও পয়েন্ট ১০, একটি ম্যাচ কম খেলেছে তারা।
এদিকে ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরে। অভিযোগ ওঠে, সেদিন বার্সেলোনার একটি নৈশ ক্লাবে এক নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তারকা দানি আলভেজ। তাৎক্ষণিক এ অভিযোগ অস্বীকার করেন আলভেজ। তবে এতেও রক্ষা হয়নি তার। ২০ জানুয়ারি আলভেজকে আটক করে বার্সেলোনা পুলিশ। এরপর থেকে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিলেন সাবেক এই বার্সেলোনা তারকা। জবানবন্দিতে তিন রকম কথা বলার পর তার বড় শাস্তি পাওয়ার গুঞ্জনও সামনে আসে। শুরুতে স্ত্রীকে পাশে পেলেও পরিস্থিতি বদলাতে সময় লাগেনি। একপর্যায়ে স্ত্রীও মুখ ফিরিয়ে নেন আলভেজের কাছ থেকে। আলভেজের স্ত্রী হোয়ানা সাঞ্জ বিচ্ছেদের ঘোষণাটা নিজেই জানান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর পর থেকে অনেকটা নিঃসঙ্গভাবেই নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে লড়ছেন আলভেজ। যদিও আইনি লড়াইয়ে আলভেজ মোটেই সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। যৌননিপীড়নের অভিযোগে তাকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীর আইনজীবী।
আগামী বছরের ৫-৭ ফেব্রুয়ারি স্পেনের আদালতে শুরু হবে আলভেজের বিচারকাজ। মূলত বড় ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার কারণেই ফুটবলের বর্ষসেরা খলনায়কদের তালিকায় ওপরের দিকে থাকবেন আলভেজ।
চলতি বছরের ২০ আগস্ট সিডনিতে নারী বিশ্বকাপ ফাইনালের পর থেকে আলোচনায় স্প্যানিশ ফুটবল সভাপতি লুইস রুবিয়ালেস। ফাইনাল শেষে পুরস্কার মঞ্চে হেরমোসোর ঠোঁটে রুবিয়ালেস চুমু খাওয়ার পর থেকেই মূলত বিশ্বফুটবলে বিতর্কের ঝড় ওঠে। শুরুটা সমালোচনা দিয়ে হলেও পরে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়। চুমুকাণ্ডের ঘটনায় রুবিয়ালেসের বিরুদ্ধে মামলা করেন হেরমোসোও। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে উপস্থিত হয়ে তিনি অভিযোগ দায়ের করেন। এ ঘটনায় অবশ্য শুরু থেকেই নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন রুবিয়ালেস।
তবে একপর্যায়ে চতুর্মুখী চাপে দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। শুধু স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতির পদ থেকেই নয়, উয়েফার নির্বাহী কমিটির সহসভাপতির পদ থেকেও সরে দাঁড়ান তিনি। ফিফাও তাকে ফুটবলীয় কার্যক্রম থেকে বরখাস্ত করে। এ ঘটনায় বর্ষসেরা প্রতিনায়কদের তালিকাতেও জায়গা হয়েছে রুবিয়ালেসের।