জাকাত ফান্ড শক্তিশালী হলে দারিদ্র্যবিমোচন সহজ হবে
—মো. ফরিদুল হক খান, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী
নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে এবারের জাকাতবর্ষ পালিত হবে
—ড. মোহাম্মদ হারুনুর রশীদ, পরিচালক, জাকাত ফান্ড বিভাগ
জাকাত ইসলামি শরিয়তের অন্যতম স্তম্ভ। দেশে দীর্ঘকাল ধরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে জাকাত ব্যবস্থা চালু থাকলেও নানা কারণে জাকাত থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাকাত উত্তোলনের প্রয়োজনীয়তা পরিলক্ষিত হয়। জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে একসময় সারা মুসলিম জাহানে দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব হয়েছিল। সে সময়ে মুসলিম দেশগুলোতে জাকাত নেয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না। তাই সরকার কর্তৃক ইসলামের বিধান অনুযায়ী জাকাতের সদ্বব্যহার ও নিঃস্ব-দরিদ্র মুসলমানদের স্থায়ী কল্যাণের উদ্দেশে এক অধ্যাদেশ বলে ১৯৮২ সালে জাকাত বোর্ড গঠন করা হয়। ওই অধ্যাদেশে জাকাত ফান্ড পরিচালনার জন্য ১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাকাত বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ডের সিদ্ধান্তসমূহ সদস্য সচিব তথা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক যথানিয়মে বাস্তবায়ন করে থাকেন।
জাকাত ফান্ড অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী-১৯৮২ সাল থেকে ৬৪ জেলায় বিত্তবানদের কাছ থেকে সংগৃহীত মোট অর্থের অর্ধেক পরিমাণ অর্থ জেলা জাকাত কমিটির মাধ্যমে গরিব ও অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করা হয়। তা ছাড়া, আর্থিক সাহায্য প্রাপ্তির জন্য যারা জাকাত বোর্ড কার্যালয়ে আবেদন করে থাকে, তাদের আবেদনসমূহ সংশ্লিষ্ট জেলা কর্তৃক যাচাই-বাছাইপূর্বক জেলা জাকাত কমিটির মাধ্যমেই বিতরণের জন্য প্রধান কার্যালয় থেকে অর্থ প্রেরণ করা হয়ে থাকে। জাকাত ফান্ডের একটি নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ দিয়ে টঙ্গী জাকাত বোর্ড শিশু হাসপাতালে শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। জাকাতের অর্থের বিভিন্ন জেলায় ২৪টি সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়ে থাকে।
জাকাত ফান্ডের কার্যক্রমসমূহ : ১. জাকাত বোর্ড শিশু হাসপাতাল; ২. সেলাই প্রশিক্ষণার্থী দুস্থ মহিলাদের জাকাত ভাতা; ৩. সেলাই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম (২৪টি কেন্দ্রে); ৪. সেলাই প্রশিক্ষণ সমাপ্তকারী দুস্থ মহিলাদের সেলাই মেশিন প্রদান; ৫. প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন; ৬. দুস্থ পুরুষদের কর্মসংস্থান কার্যক্রম; ৭. জাকাত ভাতা; ৮. শিক্ষাবৃত্তি প্রদান; ৯. নওমুসলিম স্বাবলম্বীকরণ কার্যক্রম; ১০. দুস্থ ও গরিব রোগীদের চিকিৎসা বাবদ আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম;
১১. তিনটি পার্বত্য জেলায় নওমুসলিমদের আর্থিক সাহায্য; ১২. মঙ্গা-প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন; ১৩. বৃক্ষরোপণ-নার্সারি সহায়তা কার্যক্রম। এ ছাড়াও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ৬৪টি জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে এ যাবৎ সংগৃহীত টাকার ৫০ শতাংশ টাকা প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন, দুস্থ পুরুষদের কর্মসংস্থান কার্যক্রম, জাকাত ভাতা, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, নওমুসলিম স্বাবলম্বীকরণ কার্যর্ত্রম এবং দুস্থ গরিব রোগীদের চিকিৎসা বাবদ আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম খাতে জেলা কার্যলয়ের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের যেকোনো শাখায় ‘সরকারি জাকাত ফান্ড’ শিরোনামে নির্ধারিত অ্যাকাউন্ট নম্বরে জাকাতের অর্থ জমা নেয়া হয়। রশিদ প্রদানের মাধ্যমে নগদে অথবা চেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররমস্থ দপ্তরসহ আগারগাঁওস্থ জাকাত বোর্ড দপ্তরে এবং ৬৪ জেলা কার্যালয়ে জাকাতের অর্থ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। জাকাতের অর্থ আয়কর মুক্ত।
জাকাত ফান্ডের আয়ের উৎস : জাকাত ফান্ডের আয়ের উৎস মূলত দু’টি, যথা— ক. সরকারি অনুদান এবং খ. মুসলিম জনগণ কর্তৃক স্বেচ্ছায় প্রদত্ত জাকাতের অর্থ। জাকাত ফান্ডের আয়ের উৎস জাকাত ফান্ড পরিচিতি ও নীতিমালা ২৩ (ক) সরকারি অনুদান বাবদ প্রাপ্ত অর্থে জাকাত ফান্ডে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ সব প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ করা হয়। খ. বিত্তবান মুসলিম জনগণ কর্তৃক প্রদত্ত জাকাতের অর্থ কেবল নির্ধারিত খাতে দারিদ্র্য বিমোচন ও পুনর্বাসন কাজে ব্যয় করা হয়।
গত অর্থবছরের কার্যক্রম : ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র থেকে জানা যায়, গত অর্থবছরে সরকারের জাকাত ফান্ড কর্তৃক ১০ কোটি ২১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫৮ টাকা আদায় করা হয়। এদিকে টঙ্গী জাকাত বোর্ড শিশু হাসপাতালের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৩ হাজার জন দুস্থ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ২৩টি সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্রের মাধ্যমে এক হাজার ২৫২ জন দুস্থ মহিলাকে ৬২ লাখ ৬০ হাজার টাকা জাকাত ভাতা ও সেলাই প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সেলাই প্রশিক্ষণ সমাপ্তকারী দুস্থ মহিলাদের মধ্য ২১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২১৩ জনকে সেলাই মেশিন দেয়া হয়। জাকাত গ্রহীতাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ হাজার ৩৫৭ জন জাকাত গ্রহীতার মধ্যে ছয় কোটি ২১ লাখ ৪৬ হাজার ১০০ টাকা বিতরণ করা হয়। দুস্থ প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন (পুরুষ ও মহিলা) ১৮৫ জনের মধ্যে ১২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। দুস্থ পুরুষদের কর্মসংস্থান কার্যক্রম ৮৫৭ জনের মধ্যে ৮৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। দুস্থ ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান ৪৭২ জনের মধ্যে ২৮ লাখ ৩২ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। দুস্থ নওমুসলিম স্বাবলম্বীকরণ (পুরুষ ও মহিলা) ৩২ জনের মধ্যে তিন লাখ ২০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়। দুস্থ রোগীদের চিকিৎসা বাবদ আর্থিক সহায়তা ৮০৫ জনের মধ্যে ৮০ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৪ টাকা বিতরণ করা হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন ৮৩৪ জনের মধ্যে ২৫ লাখ দুই হাজার টাকা বিতরণ করা হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জাকাত ফান্ড বিভাগের পরিচালক ড. মোহাম্মদ হারুনুর রশীদ আমার সংবাদকে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি বছর জাকাতবর্ষ পালিত হয়। এতে উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে ‘দারিদ্র্য মোচনে জাকাতের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। সারা দেশে জাকাত আদায়ে কমিটি গঠন করে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে এবারের জাকাতবর্ষ পালিত হবে।
ধর্মপ্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খান সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, জাকাত বোর্ডকে শক্তিশালী করা সম্ভব হলে এ দেশ থেকে দারিদ্র্য বিমোচন করা সহজ হবে। তিনি বলেন, জাকাত বোর্ডের ইতিহাসে গত রমজান মাসে সর্বোচ্চ প্রায় ১০ কোটি টাকা জাকাত আদায় করা সম্ভব হয়েছে। জাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরো সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সরকার ‘জাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন-২০২৩ জাতীয় সংসদে পাস করেছে।