কোম্পানিগুলোর গাফিলতির কারণে পরিবহন মালিকরা বিমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন
—ড. হাসিনা শেখ, চেয়ারম্যান, ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মন্ত্রিসভায় খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে জেনে খুব ভালো লাগছে, এটি ইতিবাচক
—নাসির উদ্দিন আহমেদ, ভাইস প্রেসিডেন্ট, বিআইএ
সড়ক পরিবহন সংশোধন আইন, ২০২৪-এর খসড়ায় সব যানবাহনের বিমা করার বিধান রাখা হয়েছে। নতুন নীতিমালায় মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, বাস, ট্রাকসহ সড়কে চলাচলকারী সব ধরনের পরিবহনের জন্য বিমা করা আবারও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। তবে এই আইন কতদিন বলবৎ থাকবে এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে অনেকের মনে। এর আগেও এই আইনটি বাধ্যতামূলক ছিল। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে বিধানটি তুলে দিয়ে ঐচ্ছিক করা হয়। যানবাহন বিমা নিয়ে সাধারণ পরিবহন মালিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রয়া দেখা যায়।
মোটরসাইকেল মালিক বাহাদুর আমার সংবাদকে জানান, বিমায় আমাদের বিশ্বাস নেই। আমরা এর আগেও বিমা করেছিলাম কিন্তু লাভ হয়নি। কিছুদিন পর এটা বন্ধ হয়ে গেছে এতে আমদেরই ক্ষতি। তাছাড়া বিমা কোম্পানিগুলো সময় মতো বিমা দাবি পরিশোধ করে না, তাতে অনেক ভোগান্তি হয়।
আরিফুল ইসলাম নামের আরেক মোটরসাইকেল মালিক জানান, আমরা বিমা করে বারবার প্রতারিত হয়েছি। বিমার প্রতি আমরা আর আগ্রহ পাচ্ছি না। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সড়ক পরিবহন সংশোধন আইন, ২০২৪-এর খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। বিমা না করলে মোটরযানের মালিকদের তিন হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে, খসড়া আইনে এমন ধারা রাখা হয়েছে। সড়ক পরিবহন আইন সংশোধন করে বিমাবিষয়ক একটি উপধারা সংযোজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। উপধারাটিতে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ৬০(২) ধারার বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহলে তা হবে একটি অপরাধ এবং এ অপরাধের জন্য তিনি অনধিক তিন হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন ব্রিফিংয়ে এ খবর জানান।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ জানান, তিনি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে আছেন এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি কথা বলতে অনিচ্ছুক ।
এদিকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সড়ক পরিবহন সংশোধন আইন, ২০২৪-এর খসড়া অনুমোদনের বিষয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট নাসির উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই সড়ক পরিবহন আইনের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। মন্ত্রিসভায় খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে জেনে খুব ভালো লাগছে। এটি বিমা খাতের জন্য ইতিবাচক, আবার যানবাহনের মালিকদের জন্যও ভালো।’
জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ ধরনের বিধান করার তথ্য জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সারসংক্ষেপ পাঠিয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চে। এতে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল, বিশ্বের কোনো দেশেই বিমা ছাড়া সড়কে কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ‘বিমা না করা কোনো যানবাহন যাতে চলাচল করতে না পারে, সে জন্য নির্দেশনা দেন’। প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, ‘আমরা দেখব, যথাযথ বিমা ছাড়া সড়কে কোনো যানবাহন যেন না চলে। এ ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সূত্রগুলো জানায়, প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যকেই আইন সংশোধনের ভিত্তি হিসেবে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের সড়ক ও মহাসড়কে চলাচলকারী মোটরসাইকেল, গাড়ি, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন ধরনের মোট যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৫৬ লাখ ৬১ হাজার ৪১৮।
এদিকে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে জানিয়েছে, বিমা করা বাধ্যতামূলক না হওয়ায় এসব গাড়ি থেকে প্রতিবছর ৮৭৮ কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এর মধ্যে কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাবদ ৮৪৯ কোটি টাকা এবং স্ট্যাম্প ডিউটি ২৮ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো সারসংক্ষেপে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একটি বিশ্লেষণ ছিল সড়ক পরিবহন আইনের ওপর। এতে বলা হয়, সড়ক পরিবহন আইনের ৬০(১) উপধারায় যানবাহনের যাত্রীর জন্য বিমা বাধ্যতামূলক রাখার পরিবর্তে ঐচ্ছিক করা হয়েছে।
আবার ৬০(২) উপধারায় ‘যথানিয়মে বিমা করবেন’ বলে যে উল্লেখ রয়েছে, তা লঙ্ঘন করলে কোনো শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। আইনের এ সুযোগ নিয়েই বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের বিমা না করিয়েই রাস্তায় নামানো হয়। আবার আইনের ৯৮ নম্বর ধারায় শাস্তির বিধানের কথা বলা আছে।
অর্থাৎ আইনেই বিভ্রান্তির সুযোগ রয়েছে। সে জন্য বিভ্রান্তি দূর করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর একটি পরিপত্র জারি করে। তাতে বলা হয়, আইনের ৬০(১), (২) ও (৩) উপধারা অনুযায়ী, তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকিবিমা বাধ্যতামূলক নয় এবং কেউ কোনো ধারা লঙ্ঘন করলে মোটরযান বা মোটরযানের মালিকের বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার সুযোগ নেই।
বিষয়টি পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) জানিয়েছে বিআরটিএ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. হাসিনা শেখ আমার সংবাদকে জানান, প্রত্যেক পরিবহন মালিকের উচিত বিমা নিশ্চিত করা। এতে তার পরিবহনটি ঝুঁকিমুক্ত থাকল এবং এটা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পরিবহন মালিকদের বিমায় অনীহার বিষয়ে তিনি বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোর গাফিলতির কারণে পরিবহন মালিকরা বিমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের আরও সতর্ক ও সাবধান হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।