দেশে সামপ্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক নতুন বাস্তবতা সামনে এসেছে, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের মতো অপরাধে যুক্ত হচ্ছে একেবারে নতুন মুখ। যাদের বিরুদ্ধে আগে কখনো এমন অপরাধে জড়িত থাকার কোনো রেকর্ড ছিল না, তারাই এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে। এ অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপদ পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট মহল।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৫ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশব্যাপী পরিচালিত বিশেষ অভিযানে মোট ৬৫০ জনকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৭১ জনই একেবারে নতুন অপরাধী। যারা পূর্বে কখনো চাঁদাবাজি বা অবৈধ দখলদারিত্বে জড়িত ছিলেন না। বাকি ২৭৪ জন আগে থেকেই চিহ্নিত অপরাধী, যাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক শূন্যতা ও প্রশাসনিক রদবদলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন শ্রেণির অপরাধী জন্ম নিচ্ছে, যারা ক্ষমতার ছায়ায় থেকে বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় দখল ও চাঁদাবাজির ‘ব্যবসা’ গড়ে তুলছে।
বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে এই চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। ঢাকা বিভাগে গ্রেপ্তার: ২৩৩ জন, যার মধ্যে ১৫০ জনই নতুন চাঁদাবাজ। চট্টগ্রাম বিভাগে গ্রেপ্তার: ৮৩ জন, ৪৬ জন আগে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত, বাকিরা নতুন। খুলনা বিভাগে গ্রেপ্তারদের ৫৭ শতাংশই নতুন মুখ। খুলনা, যা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল, সেখানে মোংলা বন্দর, সুন্দরবন, মাছ ও বনজ সম্পদ কেন্দ্র করে অপরাধীদেও আগ্রহ বেশি। খুলনা বিভাগের ফুল ও সবজির বিশাল জোগান ব্যবস্থাও অপরাধীদের নজর এড়াচ্ছে না।
এই চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের ধারাবাহিকতা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক ব্যবসায়ী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে প্রভাবশালীদের দখল ও চাঁদার ভয় মাথায় নিয়ে কাজ করছেন। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে নতুন ব্যবসা স্থাপন, শিল্প সমপ্রসারণ বা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে দেশজুড়ে গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তারা প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলম নিজেই জানিয়েছেন, অপরাধীদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। তারা যখনই পুলিশি অভিযানে টার্গেট হন, তখনই থানায় ঘেরাও, বিক্ষোভ বা অন্য কৌশলে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তিনি বলেন, “আমরা আইনের ভিত্তিতে কাজ করতে চাই, কিন্তু জনসমর্থন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া একা পুলিশ অনেক সময় পিছিয়ে পড়ে। থানা বা মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের সাহসী পদক্ষেপ তখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।”
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়াই সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, “যদি এখনই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে নতুন করে সৃষ্ট এই অপরাধীচক্র ভবিষ্যতে আরও সংগঠিত হয়ে যাবে।” তাদের মতে, আইন প্রয়োগে দলীয় বা ব্যক্তিগত পরিচয় যেন বাধা না হয়, সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন নীতিমালা বা আদেশও প্রয়োজন।
এদিকে, পুলিশ বলছে, দেশজুড়ে যারা এসব চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বমূলক অপরাধে যুক্ত, তাদের নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। এতে পুরানো অপরাধী, নতুন অপরাধী এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সব কিছু বিশ্লেষণ করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যেকোনো সময় তদন্ত বা তৎপরতার জন্য এটি সহায়ক হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, অপরাধীরা শুধু সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, তাদের কার্যক্রমের পরিধিও বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এমনকি কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থাও এদের চাঁদার টার্গেটে পরিণত হচ্ছে।