নতুন অপরাধী গোষ্ঠীর উত্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫, ১২:০৪ এএম
  • রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে নতুন অপরাধীদের আবির্ভাব
  • ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজ ও দখলদার চিহ্নিত, দ্বিতীয় স্থানে চট্টগ্রাম 
  • আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া দমন সম্ভব নয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে নতুন ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে। চাঁদাবাজি, অবৈধ দখলদারিত্ব ও সংগঠিত অপরাধের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে।

বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর এলাকাগুলোতে নতুন অপরাধীদের প্রভাব বিস্তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। 

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, এ ধরনের অপরাধ দমনে দেশব্যাপী সমন্বিত অভিযান শুরু হয়েছে, তবে প্রভাবশালী চক্রের কারণে কার্যক্রম বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। 

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৫ জুলাই থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ৬৫০ জনকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭১ জনই নতুন মুখ। তাদের বিরুদ্ধে আগে কখনো চাঁদাবাজি বা অবৈধ দখলদারিত্বের অভিযোগ ছিল না। বাকি ২৭৪ জন আগে থেকেই চিহ্নিত অপরাধী। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশে নতুন অপরাধীদের প্রবেশ বাড়ছে বলেই প্রমাণিত হচ্ছে। 

ঢাকা বিভাগে চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারিত্বের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন ও ঢাকা রেঞ্জ মিলিয়ে ২৩৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৯ জন পুরনো চিহ্নিত অপরাধী হলেও নতুন করে ১৫০ জনকে মামলার আওতায় আনা হয়েছে। 

চট্টগ্রাম বিভাগ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। শিল্প-প্রতিষ্ঠান সমৃদ্ধ এই বিভাগে ৮৩ জন গ্রেফতার হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৬ জন পুরনো মুখ হলেও নতুন করে অপরাধে যুক্ত হয়েছে সমানসংখ্যক ৪৬ জন। 

সবচেয়ে আলোচনায় এসেছে খুলনা বিভাগ। সুন্দরবন, মোংলা সমুদ্রবন্দর, মৎস্য সম্পদ ও ফুল-সবজি উৎপাদনের জন্য পরিচিত এই অঞ্চল এখন নতুন অপরাধীদের দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে। গ্রেফতারদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই নতুন মুখ, যাদের বিরুদ্ধে আগে কোনো অপরাধের রেকর্ড ছিল না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসব অপরাধের কারণে বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে, রফতানি ঝুঁকির মুখে পড়ছে, বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকানপাটে হামলা, শিল্প-কারখানায় ভাঙচুর চলছে। পুলিশে অভিযোগ করলেও প্রভাবশালীদের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায় না।”

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিস্তার দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে শুধু উদ্যোক্তাদের আস্থা কমছে না, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। 

এক বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করেন, “কোনো দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে অপরাধীরা সুযোগ নেয়। বাংলাদেশও বর্তমানে সেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।”

 অপরাধ বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যে ধরনের আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় কার্যকর হয়নি। আইনের শাসন ও জবাবদিহি না থাকলে পুলিশ অভিযানে সংকটে পড়ে। ফলে অপরাধ চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। 

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম স্বীকার করেছেন, অপরাধ দমনে প্রভাবশালীদের চাপই সবচেয়ে বড় বাধা। তিনি বলেন, “সারা দেশেই চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব রোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে। কিন্তু প্রভাবশালীরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। পুলিশ ব্যবস্থা নিলে থানা ঘেরাও, আন্দোলনের মতো ঘটনাও ঘটছে। অথচ এ সময়ে সহযোগিতা সবচেয়ে জরুরি।”

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ইতোমধ্যেই গ্রেফতারকৃতদের তথ্য নিয়ে একটি ডাটাবেজ তৈরি করছে। এর মাধ্যমে পুরনো ও নতুন অপরাধীদের আলাদা করে ট্র্যাকিং করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও র্যাবকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। 

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অভিযান চালিয়ে এ ধরনের অপরাধ দমন সম্ভব নয়। আইনের কঠোর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করলে অপরাধী চক্র আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। কারণ, অপরাধীরা যদি রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়, তাহলে সমাজে ভয়ঙ্কর বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। 

দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যবসায়িক আস্থা টিকিয়ে রাখতে এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরাধ দমন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রফতানি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।