মর্যাদা হারাচ্ছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: নভেম্বর ১১, ২০২৫, ১২:২২ এএম
  • নোমাড ক্যাপিটালিস্ট পাসপোর্ট ইনডেক্স ১৮১তম বাংলাদেশের পাসপোর্ট
  • হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স ১০৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০০
  • গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমার, আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবাননও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে

আগাম ভিসা ছাড়া এক বছর আগেও বিশ্বের ৪২টি দেশে ভ্রমণ করতে পারতেন বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী ব্যক্তিরা। সূচকে ৯৭তম থাকা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে আগাম ভিসা ছাড়া বাংলাদেশিদের ভ্রমণের এই তালিকায় ছিল এশিয়ার ৬টি দেশ ছাড়াও দক্ষিণ আমেরিকার ১টি, আফ্রিকার ১৬টি, ক্যারিবীয় ১১টি ও ওশেনিয়ার ৮টি দেশ ও অঞ্চল। 

২০২৩ সালের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান সূচকে এগিয়েছিল এক ধাপ। অথচ এক বছর পরই বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে ১০৬টি দেশের মধ্যের ১০০ তে অবস্থান করছে। বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, অভিবাসন নীতি কঠোর হওয়া এবং নিরাপত্তাজনিত নানা কারণে সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। এর ফলে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা ছাড়া ভ্রমণের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চারটি দেশ বাংলাদেশিদের জন্য ভিসামুক্ত বা আগমনী ভিসা সুবিধা বাতিল করেছে, যা আগের তুলনায় একটি বড় ধাক্কা। 

এছাড়া, অনেক দেশ এখন ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথিপত্র, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, সাক্ষাৎকার এবং দীর্ঘ সময়ের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালু করেছে। এতে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া যেমন সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠছে, তেমনি ভিসা প্রত্যাখ্যানের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং কিছু এশীয় দেশ এখন বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে কঠোর মূল্যায়ন নীতি অনুসরণ করছে।

এই পরিস্থিতিতে বিদেশে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের জন্য বাংলাদেশিদের যাত্রা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মী শুধুমাত্র ভিসা জটিলতার কারণে বিদেশে সুযোগ হারাচ্ছেন। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরাও আন্তর্জাতিক বাজারে অংশগ্রহণে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাগরিকদের চলাচল আরও সীমিত হয়ে পড়বে।

প্রতি বছর বিশ্বের ১৯৯টি দেশের পাসপোর্ট ও ২২৭টি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ গন্তব্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশ করে তাদের মর্যাদাপূর্ণ “হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স”। বৈশ্বিক ভ্রমণ স্বাধীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে এই সূচকটি বিবেচিত হয়। বছরের বিভিন্ন সময় দেশগুলোর ভিসা নীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক অবস্থান ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ তালিকা হালনাগাদ করা হয়।

২০২৫ সালের সর্বশেষ প্রকাশিত সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মান আরও অবনমন ঘটেছে। চলতি বছরে বাংলাদেশের অবস্থান নেমে এসেছে ১০০তম স্থানে, যা গত বছরের তুলনায় কয়েক ধাপ নিচে। ২০২৪ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ছিল ৯৭তম স্থানে। এই পতন শুধু সংখ্যাগত দিক থেকে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও নাগরিকদের ভ্রমণ স্বাধীনতার ওপরও এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

এদিকে চলতি বছরে প্রকাশিত নোমাড ক্যাপিটালিস্ট পাসপোর্ট ইনডেক্স-এও বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবস্থান বেশ নিচে। দুবাইভিত্তিক ট্যাক্স ও অভিবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নোমাড ক্যাপিটালিস্ট বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের বৈশ্বিক চলাচল, আর্থিক স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করে প্রতি বছর এই সূচক প্রকাশ করে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবস্থান ১৮১তম স্থানে, যা বিশ্বের প্রায় শেষের দিকের অবস্থান হিসেবে গণ্য করা যায়।

নোমাড ক্যাপিটালিস্টের সূচকটি শুধু ভিসামুক্ত ভ্রমণের সুযোগ নয়, বরং আরও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মানদ্লের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়: ভিসামুক্ত ভ্রমণ সুবিধা কোনো দেশের নাগরিক কতগুলো দেশে ভিসা ছাড়া বা আগমনী ভিসায় ভ্রমণ করতে পারেনন; কর ব্যবস্থা বিদেশে আয় করা অর্থের ওপর দেশটি কতটা কর আরোপ করে; বৈশ্বিক ধারণা বা ইন্টারন্যাশনাল পারসেপশন বিদেশে সেই দেশের নাগরিকদের কেমনভাবে দেখা হয়, তাদের প্রতি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা কেমন; দ্বৈত নাগরিকত্বের সক্ষমতা  নাগরিকরা একাধিক নাগরিকত্ব রাখতে পারেন কি না এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার মতপ্রকাশ, ভ্রমণ ও জীবনযাত্রায় কতটা স্বাধীনতা উপভোগ করেন নাগরিকরা।

এই পাঁচ সূচকের সম্মিলিত বিশ্লেষণে বাংলাদেশের মোট স্কোর ৩৮ নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নোমাড ক্যাপিটালিস্টের মানদণ্ড অনুযায়ী, যেসব দেশের স্কোর ৫০-এর নিচে, সেসব দেশের নাগরিকরা বিদেশে ভ্রমণের সময় সামাজিকভাবে অনেক সময় অবহেলা কিংবা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মুখে পড়েন। অর্থাৎ স্থানীয়রা তাদের প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ না করে বরং সতর্ক বা অনাগ্রহী মনোভাব দেখান। এই ফলাফল বাংলাদেশের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

কারণ, এটি শুধু পাসপোর্টের প্রযুক্তিগত মান নয়, বরং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি, নাগরিকদের প্রতি বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। এদিকে হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স বৈশ্বিক পাসপোর্ট সূচক অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ১০০তম অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, যেটি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সীমিত ভ্রমণ স্বাধীনতার মুখে রয়েছে। 

বাংলাদেশের মতোই, উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরাও এখন বিশ্বের ২২৭টি গন্তব্যের মধ্যে মাত্র ৩৮টি দেশে ভিসামুক্ত বা আগমনী ভিসা সুবিধা পাচ্ছেন। ২০২৫ সালের হেনলি পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান যেমন নিম্নমুখী হয়েছে, তেমনি আশ্চর্যের বিষয় হলো- গৃহযুদ্ধে জর্জরিত প্রতিবেশী মিয়ানমার পর্যন্ত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত এই দেশটির অবস্থান এখন ৯৬তম, অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে চার ধাপ উপরে।

একই অবস্থানে রয়েছে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত লেবানন। এই দুটি দেশই বহু বছর ধরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি ও সহিংসতায় জর্জরিত, তবুও তাদের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো। এটি স্পষ্ট করে যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং কূটনৈতিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক আস্থা এবং বৈদেশিক সম্পর্কের শক্তিই কোনো দেশের পাসপোর্টের মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ভুটান, একটি ছোট, পর্বতবেষ্টিত ও সীমিত সম্পদনির্ভর দেশ, তবুও সূচকে রয়েছে ৯২তম স্থানে। অন্যদিকে, প্রতিবেশী ভারত ,দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ও কূটনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশ এর অবস্থান ৮৫তম স্থানে। ভারতের নাগরিকরা এখন ৬০টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই বা আগমনী ভিসায় ভ্রমণ করতে পারেন, যা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। 

এদিকে, বাংলাদেশের  রপ্তানি প্রতিযোগী দেশ থাইল্যান্ডের অবস্থান আরও এগিয়ে, ৬৬তম স্থানে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি পর্যটন, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সংযোগে নিজেকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে থাই নাগরিকরা ৮০টিরও বেশি দেশে ভিসামুক্ত বা আগমনী ভিসায় প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন।

এই তুলনামূলক চিত্রটি বাংলাদেশি পাসপোর্টের বর্তমান দুর্বল অবস্থানকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি বা রপ্তানিতে সাফল্য সত্ত্বেও বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থান ও নাগরিক আস্থার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার পেছনে কেবল কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণই নয়, বরং কিছু নাগরিকের ভিসার অপব্যবহার, অবৈধ অভিবাসন এবং বিদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া বড় ভূমিকা রাখছে। এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদেশে ভ্রমণ ও ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। 

বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক বাংলাদেশি ভ্রমণ ভিসা ব্যবহার করে বিদেশে প্রবেশের পর নিয়মবিরুদ্ধভাবে কাজে যোগ দেন বা অতিরিক্ত সময় অবস্থান করেন, যা সংশ্লিষ্ট দেশের অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করে। এসব কারণে তারা আটক, জরিমানা ও নির্বাসনের মুখে পড়েন। আন্তর্জাতিকভাবে এসব ঘটনা রেকর্ডভুক্ত হয়, ফলে বাংলাদেশিদের প্রতি সন্দেহ ও অনাস্থা বাড়ে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো অনেক বাংলাদেশি ভ্রমণ ভিসা ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলোতে গিয়ে সেখান থেকে ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। এতে শুধু তাদের নিজের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যও ভবিষ্যতে ভিসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। 

কিছু দেশ এমন অভিযোগও করেছে যে, বাংলাদেশি ভ্রমণকারীরা ট্রানজিট রুটকে অপব্যবহার করে অবৈধভাবে অন্য দেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। এর ফলে বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীদের জন্য অনেক দেশের ট্রানজিট নীতি কঠোর হয়ে গেছে; কিছু দেশ এমনকি বাংলাদেশি নাগরিকদের ট্রানজিট ভিসা ছাড়াই বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট এলাকায় অবস্থানের অনুমতি দিচ্ছে না। অভিবাসন ও পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের সুনাম ও কূটনৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, এবং এর ফলশ্রুতিতে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি পাসপোর্টের ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বাংলাদেশের প্রয়োজন,শক্তিশালী ও পেশাদার কূটনীতি,আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সমপ্রসারণ, ভিসামুক্ত চুক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ, এবং বৈদেশিক মঞ্চে দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা।