খাদ্যপণ্যে ভেজালের বিষছোবল

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ১১:২৮ পিএম
  • চালের ১৩টি নমুনায় ক্ষতিকর আর্সেনিক, ৫টিতে ধরা পড়ে ক্রোমিয়াম
  • হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় পাওয়া যায় সিসাসহ ভারী ধাতুর অস্তিত্ব 
  • লবণে শনাক্ত হয় অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা

বাংলাদেশ আজ এক অদৃশ্য প্রাণঘাতী জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। খাবারে ভেজাল তার প্রধান কারণ। প্রতিদিন নিয়ম করে খাবার গ্রহণ করছে সবাই কিন্তু অজান্তেই শরীরে যাচ্ছে নানা বিষাক্ত উপাদান। ভাত, ডাল, মাছ, মাংস, দুধ, ফল থেকে শুরু করে মসলাসহ কোনো খাদ্যই এখন নির্ভরযোগ্য নয়। মাঠের ফসল তোলা থেকে শুরু করে শহরের রেস্তোরাঁর রান্নাঘর সব জায়গায় ভেজালের থাবা- এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে যে নিরাপদ খাদ্য আজ প্রায় অসাধ্য বাস্তবতা। এমনকি ভেজাল থেকে রক্ষা পায়নি প্রাণ রক্ষাকারী ওষুধও। 

সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে উঠে এসেছে নানা উদ্বেগজনক তথ্য। বাজারে প্রচলিত খাদ্যপণ্যের প্রায় ৬০ শতাংশেই কোনো না কোনোভাবে ভেজাল মেশানো রয়েছে। যদিও কিছু পণ্যে ভেজালের পরিমাণ তুলনামূলক কম, আবার কিছু ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। বাজারে পাওয়া দুধে ফরমালিন, ডিটারজেন্ট, সোডার মতো ক্ষতিকর উপাদান মিলছে; মাছ ও ফলমূল সংরক্ষণে ব্যবহূত হচ্ছে বিপজ্জনক কেমিক্যাল; মাংসে বাড়তি ওজন দেখানোর জন্য দেয়া হচ্ছে ইনজেকশন; এমনকি শিশুখাদ্যেও যোগ করা হচ্ছে ক্ষতিকর রং ও স্টার্চ।

পুরোদেশ যেন ভেজাল খাদ্যের এক নীরব বিপর্যয়ের মধ্যে বন্দি। নিশ্চিতভাবে এমন কোনো খাবারের নাম বলা কঠিন, যেখানে ভেজাল নেই। চাল, ডাল, আটা, মসলা, কলা, দুধ থেকে শুরু করে মিষ্টি সব ধরনের খাদ্যেই ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশে যাচ্ছে। অধিকাংশ ফল পাকানো হচ্ছে বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে, আর কিছু খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ে রং করার রঞ্জক। এসব ভেজাল খাদ্য প্রতিদিন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের  কোটি কোটি মানুষের পেটে।

চমকে দেয়ার মতো আরেকটি তথ্য হলো- শিশুখাদ্য এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল উপাদান মেশানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি মাঠের কৃষিপণ্যেও নির্বিচারে প্রয়োগ করা হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক। ফলে জনস্বাস্থ্য ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে। বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে বিক্রি হওয়া মিষ্টির প্রায় ৯০ শতাংশেই ক্ষতিকর রং ও সংরক্ষণকারী পদার্থ রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, লিভার, হূদরোগ এবং ক্যানসারের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)-এর সামপ্রতিক এক গবেষণা দেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা খাদ্য নমুনার প্রায় ৫২ শতাংশই ভিন্নমাত্রার দূষণে আক্রান্ত। প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা ৮২ ধরনের খাদ্যের মধ্যে গড়ে ৪০ শতাংশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্রহণযোগ্য সীমার তুলনায় ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পাওয়া গেছে।

এ ছাড়াও পরীক্ষায় দেখা যায়, ফলের ৩৫ শতাংশ ও শাক-সবজির ৫০ শতাংশ নমুনায় বিভিন্ন ধরনের কীটনাশকের উপস্থিতি রয়েছে। চালের ১৩টি নমুনায় অত্যন্ত ক্ষতিকর আর্সেনিক, আর পাঁচটিতে ধরা পড়ে ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসাসহ ভারী ধাতুর অস্তিত্ব পাওয়া যায় এবং লবণে শনাক্ত হয় অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা। 

শুধু উদ্ভিজ্জ খাদ্যই নয় মুরগি ও মাছেও পাওয়া গেছে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ। ২০২৪ সালে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে লবণ, হলুদ গুঁড়া, মরিচ গুঁড়া, কারি পাউডার, সরিষার তেল, বোতলজাত পানি, মাখন, আটা-ময়দা, নুডলস ও বিস্কুটসহ মোট ৪০৬টি নমুনা পরীক্ষার পর বিএসটিআই আদালতে একটি বিশদ প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ৪৬টি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ৭৪টি পণ্য মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়নি। আদালত এ সব নিম্নমানের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দেয়।

একই সময়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) গবেষণায় উঠে আসে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। দেশজুড়ে সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশেই পাওয়া গেছে দূষণের প্রমাণ। সংস্থাটির ল্যাবে ৮২ প্রকার খাদ্য পরীক্ষা করে দেখা যায় গড়ে ৪০ শতাংশ নমুনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক বিদ্যমান। এছাড়া ফলের ৩৫ শতাংশ এবং শাক-সবজির অর্ধেক নমুনায় শনাক্ত হয় বিভিন্ন ধরনের কীটনাশকের চিহ্ন। চালের ১৩টি নমুনায় পাওয়া যায় অতিমাত্রায় বিষাক্ত আর্সেনিক, আর পাঁচটি নমুনায় ধরা পড়ে ক্রোমিয়াম।

হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসা ও অন্যান্য ভারী ধাতুর অস্তিত্ব নিশ্চিত হয়, এবং লবণে পাওয়া যায় অনুমোদিত মাত্রার তুলনায় ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা। শুধু উদ্ভিজ্জ খাদ্যেই নয় মাছ ও মুরগির মধ্যেও ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ক্যাব রাজশাহীর উদ্যোগে আয়োজিত বিভাগীয় খাদ্য সমৃদ্ধকরণ ও ভোক্তা অধিকার শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে  কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক সিনিয়র সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্যাব সভাপতি বলেন, ‘ফার্মেসিতে ভেজাল ওষুধ, মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুখাদ্য এবং অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের প্রবণতা রোধে নজরদারি বাড়াতে হবে। জনগণকে জানাতে হবে তারা কীভাবে প্রতারিত হচ্ছেন।’

এদিকে বিএসটিআই ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) অনুসন্ধানে জানা যায়, বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ৮৫ শতাংশ মাছেই ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। ফল পাকানোর ক্ষেত্রেও ব্যাপকভাবে ব্যবহূত হচ্ছে কার্বাইড, ইথোফেন ও ফরমালিন।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে নিম্নমানের খাদ্যপণ্যের সংখ্যা ৮১ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৯-এ যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। এ যেন এক ভয়ঙ্কর ‘বিষ-অর্থনীতি’ যেখানে মানুষের স্বাস্থ্য নয়, মুনাফাই হয়ে উঠেছে প্রধান বিবেচ্য।