কড়াইল বস্তির বাসিন্দা রিকশা গ্যারেজকর্মী রফিকুল। পুড়ে যাওয়া ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, নির্বাক। চোখে এখন শুধু কান্না। চার বছর ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে যে ঘরটিতে কাটিয়েছেন, মুহূর্তের আগুনে সেই ঘরের সবকিছুই ছাই হয়ে গেছে। কিছুই বাঁচাতে পারেননি তিনি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছেন।
আমার সংবাদকে তিনি জানান, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না। খবর পেয়ে ছুটে এলেও ততক্ষণে আগুনের তীব্রতায় তিনি আর ভেতরে ঢুকতে পারেননি। আর্তনাদ করে বলেন, “এখন কোথায় যাবো? সঞ্চয় করা অর্থ থেকে শুরু করে বছরের পর বছর ধরে জমানো সব জিনিস মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।”
মঙ্গলবার ভয়াবহ আগুনে পুড়েছে ঢাকার মহাখালী এলাকার কড়াইল বস্তি। বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে আগুন লাগার পরই বস্তিজুড়ে মুহূর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দমকা বাতাসের সহায়তায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তা পুরো এলাকাকে গ্রাস করে ফেলে। আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে দমকলের একের পর এক ইউনিট এসেও রাতভর চেষ্টা চালিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয়। অবশেষে ২০টি ইউনিটকর্মীর অক্লান্ত চেষ্টায় সাড়ে ৫ ঘণ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে ১৬ ঘণ্টা চেষ্টার পর । ঘিঞ্জি এলাকা ও উৎসুক জনতার ভিড়ের কারণে আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসকে বেগ পেতে হয়।
ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম দোলন গণমাধ্যমকে বলেন, “ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট কাজ করে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে।” রাজধানীর গুলশান ও বনানী লাগোয়া প্রায় ৯০ একর জায়গায় কড়াইল বস্তি। এখানে প্রায় দুই লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। দিনমজুর, রিকশাচালক, পোশাককর্মী, ছোট দোকানি বেশিরভাগই সীমিত আয়ের মানুষ, যাদের দিন চলে দৈনিক আয়ের উপর নির্ভর করে।
বস্তির ঘরগুলো টিন, বাঁশ আর কাঠে নির্মিত যা অগ্নিকাণ্ডের জন্য সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ। একবার আগুন লাগলে মুহূর্তেই বিস্তার ঘটে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আগুনের লেলিহান শিখায় চোখের সামনেই পুড়ে যায় সেখানে বসবাসকারীদের শেষ সম্বল।
ঘরবাড়ি হারিয়ে এখন তাদের চোখে জীবনের নতুন হিসাব কোথায় থাকবেন, কীভাবে খাবেন, কীভাবে আবার ঘর তুলবেন। শিশু থেকে প্রবীণ পর্যন্ত সবার মুখেই আতঙ্ক আর অস্থিরতা। ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের খবর এখনো পাওয়া যায়নি। তবে পুড়ে গেছে প্রায় ১৫শ ঘর। ঘটনাস্থলে মানুষজনের চিৎকার, ঘরবাড়ি বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিবেশ সব মিলিয়ে পুরোএলাকা পরিণত হয়েছিল এক আতঙ্কগ্রস্ত অগ্নিকাণ্ডের ধ্বংসস্তূপে। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন বস্তিবাসীরা। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন নিজের হারানো জীবনের দিকে।
অনেকেই ভাঙাচোরা ঘরের ভেতর খুঁজে ফিরছেন বেঁচে থাকার শেষ চিহ্নটুকু। খাবার ও পানির মতো প্রাথমিক চাহিদার জন্যও এখন তাদের অন্যের সহায়তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ঘটনাস্থলে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে তুলে দিচ্ছেন খাবার, পানি এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী, যেন অন্তত সাময়িকভাবে হলেও তাদের পাশে দাঁড়ানো যায়। আগুনের তাণ্ডব থেকে প্রাণে রক্ষা পেলেও সহস্রাধিক পরিবার সম্পদের দিক থেকে সম্পূর্ণভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছে।
ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে অনেকেই বলছেন জীবন কোনোভাবে টিকে আছে, তবে তাদের বসতঘর, প্রয়োজনীয় আসবাব, সঞ্চয়, আর ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেছে। তাই তো কেউ নির্বাক, কেউ খুঁজছেন বেঁচে থাকার শেষ আশা। এখন যা আছে, তা শুধু ধোঁয়া ওঠা ভাঙাচোরা স্মৃতি আর শূন্য ভবিষ্যতের ভার। এদিকে আগুনে বাড়ি-ঘর সব পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোতে খাবার এবং পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পরিবারের পুরুষ অভিভাবক আগুন এবং ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় নারী ও শিশুদের খাবারের সংকটে পড়তে দেখা গেছে।
তবে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও সমবেদনা প্রকাশ করেছে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ডে যেসব পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট আমাদের সকলের বেদনার। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে।
এদিকে রাজধানীর কড়াইল বস্তির অগ্নিকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এতে তিনি বলেন, ‘এই বিপজ্জনক অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। তারা এই কঠিন সময়ে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশা রাখি।”
অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের খোঁজ-খবর নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় জামায়াত আমীরের সঙ্গে ছিলেন ঢাকা মহানগরী উত্তর মেডিকেল থানা সভাপতি ও ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. এস এম খালিদুজ্জামান, জামায়াত আমীরের পার্সোনাল সেক্রেটারি নজরুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও বহু কর্মী।
এছাড়া কড়াইল বস্তিতে আগুনের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। কমিটিকে আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।