প্রবাসে কমেছে বাংলাদেশি নারী কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২৫, ১২:০১ এএম
  • ৩ বছরে প্রায় ৫৭ শতাংশ কমে গেছে বিদেশগামী নারী কর্মীর সংখ্যা
  • যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরছে অনেকে
  • বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও সেই তুলনায় ধারাবাহিকভাবে কমছে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ

দেশের শ্রমবাজার এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে নানা কারণে। দুঃখজনক যে, দেশের শ্রম বাজারের সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এদিকে প্রবাসে নারী কর্মীও কমেছে। বিদেশে নারী কর্মসংস্থানের মূল গন্তব্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এসব দেশে অধিকাংশ নারী গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। গিয়ে নানা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন কেউ কেউ। 

এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের অভিযোগও আছে। এতে নারীদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার উৎসাহ কমছে। ফলে দুই বছর ধরে বিদেশে নারী কর্মী যাওয়া কমছে। বিদেশে ভালো জীবনের আশায় পাড়ি জমালেও অনেক নারীকে সেখানে ক্ষুধার যন্ত্রণা, শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কেউ কেউ আবার প্রাণ হারিয়েও দেশে ফিরেছেন। এসব পরিস্থিতির প্রভাবেই গত তিন বছরে বিদেশগামী নারী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫৭ শতাংশ কমে গেছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধস থামাতে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা বৃদ্ধির প্রতি জোর দিতে হবে। নারী শ্রমিকদের অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এখনো তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিক শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং কম মজুরির মতো সমস্যার মুখোমুখি হন। 

ওকাপের এক গবেষণায় দেখা যায়, ৯৪ শতাংশ নারী কর্মী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, আর যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা রয়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশের। এসব কারণে বিদেশে যাওয়ার প্রতি নারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যেখানে এক লাখ ১৮ হাজার ৮৮ নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন, সেখানে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৮ জনে। অর্থাৎ ২০১৬ সালের পর থেকে নারী শ্রমিক অভিবাসন প্রায় ৬৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই ধারা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লেও সেই তুলনায় নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত তিন বছরে বিদেশে চাকরির বিপুল চাহিদা তৈরির ফলে মোট ৩৪ লাখেরও বেশি মানুষ কর্মসূত্রে বিদেশ গেছেন, কিন্তু এর মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা আড়াই লাখও হয়নি।

ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমালেও অনেক নারীর জীবনের গল্প হয়ে উঠেছে যন্ত্রণায় ভরা। সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বহু নারী মানবেতর নির্যাতন সয়ে দেশে ফিরেছেন। সেখানে তাদের ঠিকমতো খাবার দেয়া হতো না, চলত মারধর ও যৌন নিপীড়ন।

কষ্টের মধ্য দিয়ে দেশে ফিরলেও স্বস্তি মেলেনি; বরং সমাজের কটুবাক্য আর সন্দেহের দৃষ্টির ভার বইতে হচ্ছে প্রতিদিন। ভুক্তভোগী নারীরা জানান, বিদেশে সামান্য প্রতিবাদ করলেই মালিকরা বলত, ‘টাকা দিয়ে তোকে কিনেছি।’ আর দেশে ফিরে সমাজের চোখেও তারা অবহেলিত, কেউ গুরুত্ব দিতে চায় না।

নারী কর্মীদের প্রতি বিদেশে এই ধরনের শোষণ ও নির্যাতনের ঘটনা বাড়তে থাকার পর থেকেই বিদেশগামী নারীদের সংখ্যা কমছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, করোনা-পরবর্তী ২০২২ সালে দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নারী কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু এর পর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে নারী কর্মী প্রেরণ কমেছে প্রায় ৫৬.৬ শতাংশ।

২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর প্রতি বছরই এক লাখের বেশি নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ২০২০ সালে মহামারির প্রভাবে এই সংখ্যা কমে যায়। পরবর্তী দুই বছর কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও সামপ্রতিক দুই বছরে আবার নারী কর্মী প্রেরণ হ্রাস পাচ্ছে। 

অভিবাসনের অপেক্ষায় থাকা নারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘যারা দালালের মাধ্যমে যায়, তারা ওদের ফাঁদে পড়ে গেলে ওখানে এ কাজ হয়। যারা হাউজ ভিসায় যায় তাদের ক্ষেত্রে এরকম শোনা যায় যে, স্যালারি ঠিকমতো হয় না, টর্চার করে। আমরা যাচাই-বাছাই করেই যাচ্ছি।’ 

বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্যাপ্ত দক্ষ ও প্রশিক্ষিত না হওয়ায় বিদেশে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা। নারী অভিবাসনের সমস্যা সমাধানে লেবার উইংগুলোর সদিচ্ছার অভাব আছে বলেও জানান তারা।