আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে দেশের সর্ববৃহৎ সরকারি মালিকানাধীন ইসলামী ব্যাংক ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’। বাংলাদেশ ব্যাংক গত সোমবার চূড়ান্ত অনুমোদন ও লাইসেন্স ইস্যু করার পর গতকাল থেকে ব্যাংকটির কার্যক্রম চালু হয়। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ উদ্যোগ ইসলামী ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আমানত ফেরতের প্রক্রিয়া গতি পাবে। আগামী সপ্তাহ থেকেই গ্রাহকদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত দেয়া শুরু হবে। এরপর বড় অঙ্কের আমানত পর্যায়ক্রমে ফেরতের জন্য রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে আস্থার চ্যালেঞ্জে পড়তে হতে পারে এ ব্যাংককে।
নভেম্বর শেষ হলেও প্রতিশ্রুত টাকা এখনো পাননি হাজারো আমানতকারী। গভর্নরের ঘোষণা অনুযায়ী নভেম্বরের মধ্যেই টাকা ফেরত দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু মাস শেষ হলেও ছোট অঙ্কের আমানতকারীদের হাতে সেই টাকা পৌঁছায়নি। ফলে তারা দিনে দুই-তিনবার ব্যাংকে ছুটে যাচ্ছেন কখনো সকালে, কখনো বিকেলে- আশা করছেন আজ হয়তো টাকা মিলবে। কিন্তু প্রতিদিনই একই হতাশা নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। বন্ধ কাউন্টার, প্রায় খালি লবি আর ব্যাংকারদের নিরুপায় মুখ- সব মিলিয়ে তাদের সঞ্চয়ের জন্য এখন শুধু প্রহর গোনা ছাড়া উপায় নেই।
রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, গুলশানসহ বিভিন্ন শাখায় ঘুরে দেখা যায়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামের নতুন একীভূত ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরু করলেও একীভূত হওয়া অন্যান্য ব্যাংকের শাখাগুলোতে নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা। যেখানে আগে সকাল থেকেই গ্রাহকের ভিড় থাকত, এখন সেখানে কাউন্টার ফাঁকা পড়ে থাকে। অনেক গ্রাহক শুধুমাত্র তাদের ডিপিএস বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক মাসিক কিস্তি জমা দিতে আসছেন। কিন্তু নগদ উত্তোলন কার্যত বন্ধ।
তারা প্রশ্ন করছেন- গভর্নর যখন বলেছিলেন নভেম্বরেই টাকা মিলবে, তাহলে নভেম্বর শেষ হয়ে গেলেও টাকা ফিরছে না কেন? শাখার ব্যাংকাররা বলছেন, বারবার এসে টাকা না পেয়ে গ্রাহকরা নিজেরাই আসা কমিয়ে দিয়েছেন। সরকার ঘোষিত অর্থ পুরোপুরি ছাড় না হওয়া পর্যন্ত আমানত ফেরত দেয়া সম্ভব নয়, এ বার্তাটি এখন সবার কাছে পরিষ্কার।
গতকাল দুপুরে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের তোপখানা রোড শাখায় দেখা যায়, দীর্ঘক্ষণেও কোনো গ্রাহক নেই। এক ঘণ্টা পর একজন গ্রাহক এসে জানান, তিনি মাসিক ডিপিএসের কিস্তি জমা দিতে এসেছেন। কিছুক্ষণ পর আরেকজন একই কারণে আসেন।
গ্রাহক হৃদয় জানান, ‘আমার পাঁচ বছর মেয়াদি ডিপিএস আছে। শুনেছি অনেকে টাকা তুলছেন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সরকার নিশ্চয়ই টাকা ফেরত দেবে। ব্যাংক এখন সরকারি মালিকানায়, তাই আমার সঞ্চয় ফিরে আসবেই। তার ওপর এখন ডিপিএস ভেঙে ফেললে ঘোষিত প্যাকেজ অনুযায়ী যে সুবিধা পাওয়ার কথা, তা থেকেও বঞ্চিত হব।’
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের নয়াপল্টন শাখায়ও একই অবস্থা; গ্রাহক নেই, কর্মকর্তারা নিজেদের কাজেই ব্যস্ত। এক্সিম ব্যাংকের মতিঝিল শাখায়ও আগের মতো ভিড় নেই, তবে কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে নারাজ। কারণ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে কথা না বলার নির্দেশ রয়েছে।
অন্যদিকে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনাকেই প্রধান কাজ বলে জানিয়েছেন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, একটি সরকারি মালিকানার ইসলামী ব্যাংক চালু হওয়া জাতির জন্য সুসংবাদ। ব্যাংকটিকে সঠিক কাঠামোতে প্রতিষ্ঠা করতে ইতোমধ্যে অনেকগুলো কারিগরি টিম কাজ শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘দায়িত্ব নেয়ার পর আমাদের প্রথম লক্ষ্য হলো আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন। এরপর আইনসম্মতভাবে পাঁচটি ব্যাংকের সম্পূর্ণ একীভূতকরণ সম্পন্ন করাই বড় চ্যালেঞ্জ।’ সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে লাইসেন্স ইস্যু করার পর থেকেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। নতুন ব্যাংকটির পেইড-আপ ক্যাপিটাল হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ২০ হাজার কোটি দিচ্ছে সরকার, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি আসছে আমানতকারীদের শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে।
ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ব্যাংকটির অনুকূলে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন ছাড় করেছে, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট থেকে এসেছে। সোমবার এই অর্থ নতুন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমাও হয়েছে। তবু বাস্তবে আমানতকারীরা টাকা পাওয়ার অপেক্ষায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। নতুন ব্যাংক কার্যক্রম শুরু হলেও তাদের কাছে মূল প্রশ্ন- জমানো টাকা তারা কবে ফিরে পাবেন?