দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে তালাবদ্ধ হয়ে পড়েছে সহকারী শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে। টানা ছয় দিন ধরে চলা আন্দোলনের অংশ হিসেবে গতকাল থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেছেন। এতে বন্ধ হয়ে গেছে সব ক্লাস, থেমে আছে বার্ষিক পরীক্ষাও। হঠাৎ করে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভিভাবকরা বিপাকে পড়েছেন এবং ছোট শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে।
শিক্ষক নেতারা জানান, তাদের তিন দফা দাবির বিষয়ে বহুদিন ধরে আশ্বাস দেয়া হলেও ২২ দিনেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই তারা তালাবদ্ধ কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ ও সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের যৌথ আহ্বানে ঘোষণা করা এই কর্মসূচির আওতায় সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। শিক্ষকরা এ সময়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকবেন না; শুধুমাত্র প্রথম দিনে একজন শিক্ষক গিয়ে সংশ্লিষ্টদের স্কুল বন্ধের বিষয়টি জানিয়ে আসবেন।
সহকারী শিক্ষকদের তিন দফা দাবি হলো— সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা, চাকরিতে ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার জটিলতা দূর করা ও সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির ব্যবস্থা করা।
এ ছাড়া আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী কয়েকজন শিক্ষককে শোকজ নোটিশ দেয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল দেশের সব উপজেলা শিক্ষা অফিসে প্রতিবাদ সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।
শিক্ষক নেতাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বারবার আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। তারা বলছেন, ন্যায্য দাবি আদায় হলে এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা সব স্কুল খুলে দেব; কিন্তু দাবির সমাধান না হলে আন্দোলন বন্ধের প্রশ্নই আসে না। প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের এক নেতা বলেন, টানা কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষার পরও প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি; তাই শাটডাউন ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
অন্যদিকে অভিভাবকরা জানান, বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্কুল বন্ধ থাকায় তাদের সন্তানদের পড়াশোনায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। পরীক্ষাও স্থগিত থাকায় শিক্ষার্থীরা মানসিক দুশ্চিন্তায় পড়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, ‘এভাবে স্কুল বন্ধ হলে ছোট ক্লাসের বাচ্চারা পড়ালেখা থেকে পুরোপুরি ছিটকে যায়।’ আরেকজন বলেন, ‘সরকার ও শিক্ষকদের দ্রুত আলোচনায় বসে সমস্যা সমাধান করা উচিত।’
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে মোট ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিন লাখের বেশি শিক্ষক কর্মরত আছেন। প্রধান শিক্ষকরা ইতোমধ্যে ১০ম গ্রেডে থাকলেও সহকারী শিক্ষকরা এখনো ১৩তম গ্রেডে রয়েছেন। এর আগেও তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন, যেখানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে দেড় শতাধিক শিক্ষক আহত হন। পরে মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে কাজে ফিরলেও দাবি বাস্তবায়নের অগ্রগতি না থাকায় পুনরায় আন্দোলনে নামেন।
চলমান শাটডাউনের ফলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা কার্যত থেমে গেছে। শিক্ষকরা বলছেন, সমস্যার সমাধান সরকারকেই দ্রুত করতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা আবার স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারে। এদিকে আর্থিক সুবিধা, পদোন্নতিসহ চার দফা দাবিতে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন।
গত সোমবার থেকে বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির ব্যানারে এ কর্মসূচি শুরু হয়। মূলত পুরোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে কর্মসূচি চলাকালীন পরীক্ষা হয়নি। বার্ষিক পরীক্ষার মধ্যে কর্মবিরতির কারণে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ফলে মঙ্গলবার রাতে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, পরীক্ষার অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা যে মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন, তা অনুধাবন করে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। তাই ৩ ডিসেম্বর বার্ষিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে তাদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া সমাধানের পথে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ চেয়েছে সমিতি। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় কার্যত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।