বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংক পিএলসির সামগ্রিক কার্যক্রম নতুন করে সংগঠিত ও গতিময় করার লক্ষ্যে নতুন ম্যানেজমেন্ট গঠন ও নীতি-কৌশল প্রণয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া নতুন এমডি ও সিইও মো. শওকত আলী খানের নেতৃত্বে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংককে লাভজনক, সুষ্ঠু ও গ্রাহকমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলাই আজকের অগ্রাধিকার।
নতুন নেতৃত্ব : কেন মো. শওকত আলী খান
২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর মো. শওকত আলী খানকে সোনালী ব্যাংক পিএলসির এমডি ও সিইও হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই নিয়োগ ছিল তিন বছরের জন্য, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
তিনি ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করেন ১৯৯৮ সালে একটি প্রখ্যাত বাণিজ্যিক ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি রূপালী ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশের আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তার ২৬ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা আছে, যেখানে তিনি একাধিক বিভাগে কাজ করেছেন— জনশক্তি ও প্রশাসন (এইচআরএডমিন), শিল্প ঋণ (ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট), সাধারণ ও এসএমই ঋণ, কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ, মাইক্রো ক্রেডিট, ফরেন ট্রেড ফাইন্যান্স ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, গৃহঋণ (হোম লোন), আইসিটি, আইন, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং (এএমএল) সংক্রান্ত কাজ করেছেন।
বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি সম্প্রতি বলেছেন যে, ২০২৫ সাল হবে ‘আস্থা আর সেবায় সমৃদ্ধির পথে’ অর্থাৎ গ্রাহকের আস্থা ও মানসম্পন্ন সেবা প্রদানের ভিত্তিতে ব্যাংককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি একসঙ্গে সোনালী ব্যাংক পিএলসিকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার জন্য আজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
ব্যাংকে বিভিন্ন স্তরের ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি)/সিইও : ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। নীতি নির্ধারণ, কৌশল গঠন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আইন/বিধি মেনে চলা- সবই এই স্তরের অধীনে।
অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), মহাব্যবস্থাপক, ব্যবস্থাপক : বিভিন্ন বিভাগ ও শাখা পরিচালনা, কার্যক্রম তদারকি, দৈনন্দিন লেনদেন, গ্রাহক সেবা, শাখা ব্যবস্থাপনা, ঋণ প্রদান, আমানত গ্রহণ, হিসাব রক্ষণ, কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও কার্যকারিতা ইত্যাদি বাস্তবায়ন করেন।
মহাব্যবস্থাপক (জেনারেল ম্যানেজার) স্তর : ব্যাংকের কৌশলগত অংশ, বিভাগীয় পরিকল্পনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকি অর্থাৎ এমডির নেয়া সিদ্ধান্তগুলো মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ ও সমন্বয়।
ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) : শাখা বা বিভাগের নিয়মিত কাজ পরিচালনা, কর্মীদের নেতৃত্ব, গ্রাহক-সেবা, নিয়মনীতি পালন, লক্ষ্য অর্জন ইত্যাদি নিশ্চিত করে।
এই ব্যবস্থাপনা শ্রেণিবিন্যাসকে মসৃণভাবে পরিচালনায় এবং লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক। আপনার দেয়া কাঠামোগুলোর ওপর ভিত্তি করে, বর্তমান ব্যবস্থাপনায় এই শ্রেণিবিন্যাসই বাস্তবায়ন করা উচিত এবং করছে- বিশেষ করে নতুন এমডির অধীনে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট : চ্যালেঞ্জ ও নতুন উদ্যোগ
মো. শওকত আলী খানের নেতৃত্বে সোনালী ব্যাংক পিএলসি, এখন কয়েকটি চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছে।
পুঁজিসংক্রান্ত ঘাটতি ও উন্নয়ন : রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য সাধারণত পুঁজির ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি জানিয়েছেন, যদিও ২০২৪ সালের শুরুতে ব্যাংকের পুঁজিসংক্রান্ত ঘাটতি ছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে। তার ভাষায়, পুঁজিসংক্রান্ত ঘাটতি কমাতে, অ্যাসেট কোয়ালিটি উন্নত করতে এবং ব্যাংককে স্থিতিশীল করতে তারা কাজ করছে।
আমানত ও জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার : ব্যাংককে জনসাধারণের আস্থার মধ্য দিয়ে পুনরজ্জীবিত করার জন্য, নতুন ব্যবস্থাপনা গ্রাহক-সেবার উন্নতি, শাখা-শাখা কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। একই সঙ্গে ব্যাংক জানিয়েছে, গ্রাহক-সংযোগ, সময়মতো সেবা, দায়িত্বশীল ঋণায়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থায় নিয়মিত তদারকি জোরদার করার জন্য শাখা ও বিভাগের স্তরে কাজ হবে।
মানবসম্পদ ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন : নতুন ম্যানেজমেন্টের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা সম্প্রসারণ নয় বরং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, তাদের উৎসাহ ও সম্পৃক্ততা বাড়ানো। ২০২৫ সালের জন্য একটি ‘১০০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি’ ঘোষণা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ব্যাংকের ব্যক্তিগত অফিস থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের শাখা পর্যন্ত কর্মদক্ষতা ও সেবা মান উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এছাড়া, ‘সেরা কর্মী পুরস্কার’ চালু করার কথাও বলা হয়েছে, ফলে মনোবল ও দায়িত্ববোধ বাড়বে।
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য : নতুন এমডি বলেছেন, ২০২৫ হবে ‘আস্থা আর সেবায় সমৃদ্ধির’ অর্থাৎ ব্যাংক শুধু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নয়, সার্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রাহক-সেবার দিক দিয়ে উন্নত হবে। এই কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শাখা-সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ঋণপুনরায়ন, গ্রাহক-পরিচর্যা উন্নয়ন, ঝুঁকি কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার দিকেও নজর দেয়া হচ্ছে।
কেন বর্তমান মুহূর্তে নতুন ম্যানেজমেন্ট জরুরি ছিল : বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ‘সোনালী ব্যাংক পিএলসি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছে কিন্তু গতিশীলতা, দক্ষতা ও সময়োপযোগী সেবা প্রদানে সময়মতো সবসময় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকতে পারেনি। পুরনো ব্যবস্থাপনায়- পুঁজির ঘাটতি, অবিত্তীয় ঋণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, গ্রাহক-সেবা ও শাখা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বা মনোবলের অভাব, কার্যকরী নীতি ও দৃষ্টিকোণ অভাব। এসব কারণে ব্যাংকের কার্যক্রম গতি হারিয়েছে। নতুন এমডি ও তার ম্যানেজমেন্ট টিম এই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে পুরনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ব্যাংককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ শুরু করেছেন।
এই পরিবর্তন শুধুমাত্র পরিচালনাগত নয়, এটি সোনালী ব্যাংকে পুনরুজ্জীবিত করে, জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে এনে, ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী উপস্থাপিত করবে।
সম্ভাব্য সাফল্য ও দায়িত্ব
মূল কিছু দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হলো, যেখানে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনে দ্রুত বাস্তবায়ন ব্যাংককে সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে- পুঁজির ঘাটতি কমিয়ে ব্যাংককে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল ও আত্মনির্ভরযোগ্য করে তোলা। গ্রাহক-আস্থা ও সেবা মান উন্নয়ন, সময়মতো ঋণ, আমানত, শ্রেষ্ঠ শাখা-পরিচর্যা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে জন-বিশ্বাস পুনরুদ্ধার। কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও উৎসাহিত করা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, মনোবল ও দায়িত্বশীলতা। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব, ঋণ প্রদানে সতর্কতা, উপযুক্ত যাচাই-বাছাই এবং শাখা-নিয়মিত তদারকি। কৌশলগত পরিকল্পনা ও শাখা সমপ্রসারণ, দেশব্যাপী শাখা ও বিভাগ সমপ্রসারণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং, এসএমই-ঋণ, গ্রামীণ ও কৃষি ঋণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি। এগুলোর সফল সমন্বয় হলে সোনালী ব্যাংক পিএলসি সবার মাঝে বিশ্বাসযোগ্য, কার্যকর ও লাভজনক ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন ও দৃষ্টিকোণভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট এখন খুবই সময়োপযোগী। সোনালী ব্যাংক পিএলসি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, যদি নতুন নেতৃত্বের কৌশল, দায়িত্ব, পরিকল্পনা ও উদ্যোগকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে শুধু আর্থিক দিক থেকে নয়, সামাজিক বিশ্বাস, গ্রাহক-সেবা এবং দেশের অর্থনৈতিক গুণগত উন্নয়নের দিক থেকেও এটি গুরত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
আমাদের প্রত্যাশা, ম্যানেজমেন্ট স্তর থেকে শুরু করে শাখা ও মাঠপর্যায় পর্যন্ত সব স্তর একসঙ্গে কাজ করবে, দলগত দায়বদ্ধতা নিবে এবং একটি স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল, গ্রাহক-মুখী ও লাভজনক ব্যাংক গঠন করবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, জনগণের আস্থা ও সেবা নিশ্চিতে, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, নতুন অধ্যায় শুরু করেছে, সেই শুভমূহূর্তে আমরা সবার জন্য শুভকামনা জানাই।
ইএইচ