ভিসা সেন্টার বন্ধ

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে উদ্বেগ

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫, ১০:৪৬ পিএম
  • দুই ইস্যুতে সম্পর্কের আরও বেশি অবনতি
  • লং মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন কর্মসূচিতে পুলিশের বাধা
  • হাইকমিশনারকে তলব ভারতের, ভারতের বক্তব্যের শক্ত জবাব পররাষ্ট্র উপদেষ্টার

২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। সীমান্ত সমস্যা, ভিসা নীতি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বক্তব্য সবকিছুতেই তীব্রতা বেড়েছে। 

যদিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে দিল্লি-ঢাকার আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দুই ইস্যুতে নতুন করে সম্পর্কের আরও অবনতি দেখা গেছে। শেখ হাসিনা-কামালের রায় পরবর্তী ‘তাদের দেশে ফেরানো ও ওসমান হাদির ওপর হামলাকারীদের ভারতে পলায়ন’ দুই দেশের সম্পর্কে চলা আগুনে যেন নতুন করে ঘি ঢেলেছে। 

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে ভারতে অবস্থানরত জুলাই গণহত্যার পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দেশে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে এবং ভারতীয় প্রক্সি, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও সরকারি কর্মকর্তাদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গতকাল ‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে জুলাই ঐক্য নামে একটি সংগঠন। 

‘মার্চ টু ইন্ডিয়ান হাইকমিশন’ কর্মসূচি ঘিরে গতকাল দুপুর থেকে ঢাকার রামপুরা ব্রিজ এলাকায় একত্রিত হন বিক্ষোভকারীরা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে এসে তারা বিক্ষোভে যোগ দেন।

বিক্ষোভকারীরা সড়কে অবস্থান নেয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চলমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে (বুধবার) দুপুর ২টা থেকে রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা সেন্টার বন্ধ ঘোষণা করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। 

আইভ্যাকের ওয়েবসাইটে এক বিজ্ঞপ্তিতে ‘নিরাপত্তার কারণে’ দিনের কার্যক্রম বন্ধের কথা বলা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আপনাদের নজরে আনা যাচ্ছে যমুনা ফিউচার পার্ক ঢাকার আইভ্যাক আজ দুপুর ২টায় বন্ধ করা হবে। আজকের দিনে ভিসা আবেদন জমার স্লট যাদের রয়েছে, তাদেরকে পরবর্তী অন্যদিনে স্লট দেয়া হবে।’

পরে বিকেলে লংমার্চ নিয়ে ইন্ডিয়ান হাইকমিশন অভিমুখে যাত্রা শুরু করলে বাড্ডা এলাকায় পুলিশের বাধার মুখে পড়ে তারা।

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বিক্ষোভকারীরা ভারতীয় হাইকমিশনের দিকে যাত্রা শুরু করে। পুলিশ উত্তর বাড্ডায় ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়। পুলিশের বাধার মুখে পড়ে সেখানেই অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দেন মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা।

এর আগে সোমবার ঢাকার শহীদ মিনারে আয়োজিত একটি সভায় হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ভারতকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, যারা আমার দেশের সার্বভৌমত্বকে বিশ্বাস করে না, যারা আমার দেশের সম্ভাবনাকে বিশ্বাস করে না, যারা ভোটাধিকার-মানবাধিকারকে বিশ্বাস করে না, যারা এ দেশের সন্তানকে বিশ্বাস করে না, আপনারা (ভারত) যেহেতু তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কথা স্পষ্ট করে বলে দিতে চাই- ভারতের যারা সেপারেটিস্ট আছে, বাংলাদেশে আমরা তাদের আশ্রয়-প্রশয় দিয়ে যে সেভেন সিস্টার্স আছে সেটাকে ভারতে থেকে আলাদা করে দেবো।’ 

এদিকে এসব কর্মসূচি ও বক্তব্যের জেরে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে তলব করে ‘বাংলাদেশের ক্রমাবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জোরালো উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডও বিশেষভাবে তার নজরে আনা হয়েছে, যারা ঢাকার ভারতীয় মিশনকে কেন্দ্র করে একটি নিরাপত্তা পরিস্থিতি তৈরির ঘোষণা দিয়েছে।’

ভারত বলেছে, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উগ্রবাদী শক্তি যে মিথ্যা বয়ান তৈরি করতে চায়, ভারত তা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, অন্তর্বর্তী সরকার এর বিস্তারিত তদন্তও করেনি আর এসব ঘটনায় অর্থবহ কোনো প্রমাণও ভারতের কাছে দেয়নি।’ 

এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশও। বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে তলব করা ‘স্বাভাবিক’ হিসেবেই দেখছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তবে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যে বক্তব্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়েছে, এমন ‘নসিহত অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

গতকাল বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের এ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা তাদের হাইকমিশনারকে ডেকেছি। এটার ব্যাপারে আমরা যা কিছু বলেছি, সেটা তারা গ্রহণ করে নাই; তাদের কিছু দ্বিমত আছে এ বিষয়ে। একইভাবে আমাদের হাইকমিশনারকেও তারা ডেকেছে। এটা খুব অপ্রত্যাশিত না। সাধারণত এটা ঘটে। একজনকে ডাকলে, আরেকজনকে ডাকা হয়।’ এর বিপরীতে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত সরকারের করা মন্তব্যে জোর আপত্তি তার। যেটি তার ভাষায় ‘নসিহত’।

তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ যে বক্তব্য তাদের, তাতে কিছু নসিহত করা হয়েছে আমাদের। এই নসিহত, আমি মনে করি না যে এটার কোনো প্রয়োজন আছে আমাদেরকে এভাবে করার। বাংলাদেশে নির্বাচন কেমন হবে, এটা নিয়ে আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের উপদেশ চাই না। আমরা, এই সরকার প্রথম দিন থেকে স্পষ্টভাবে বলে আসছে যে, আমরা একটা অত্যন্ত উচ্চ মানের, মানুষ যেন গিয়ে ভোট দিতে পারে, সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই, যে পরিবেশ গত ১৫ বছর ছিল না।’

এর আগে ভারতের হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশ। ভারত বিবৃতি দিয়ে সে সময় ঢাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। এর আগে শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারতকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের দেয়া চিঠি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলেও জানায় ভারত।