জনস্রোতে বিদায় বীর-বিপ্লবী হাদির

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ১২:১৪ এএম

চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন বিপ্লবী শহীদ শরিফ ওসমান হাদি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সংলগ্ন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশেই ওসমান হাদিকে দাফন করা হয়েছে। পরে তার কবরে রক্তজবা ফুলগাছ রোপণ করা হয়।

গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

এর আগে দুপুর আড়াটার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় লাখো জনতার অংশগ্রহণে বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকের ইমামতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত। জানাজা শেষে ওসমান হাদিকে দাফন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে।

সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে শরিফ ওসমান হাদি মারা যান। সেদিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

এর অংশ হিসেবে গতকাল সব সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ছিল, পালিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় শোক।

এদিকে ওসমান হাদির জানাজা ইতিহাসের অন্যতম বড় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন উপস্থিত জনতা। কয়েক লাখ মানুষের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় অংশগ্রহণকারী মিরপুরের বাসিন্দা এসএম মানিক বলেন, আমার জীবনে অনেক জানাজায় অংশ নিয়েছি। কিন্তু এত বড় জানাজা দেখিনি। শহীদ হাদি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। এ কারণে এত মানুষ জানাজায় অংশ নিয়েছেন।

শহীদ হাদির জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য গতকাল শনিবার সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষের মিছিল ছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর দিকে। রাজধানীর সব পথ যেন এসে মিলে যায় এক মোহনায়।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ফার্মগেট, আসাদ গেট হয়ে দলে দলে মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ঢুকছেন। কেউ হাতে, কেউ মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে জানাজায় অংশ নিতে এসেছেন। ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনের মাঠে লোকজন জড়ো হয়েছেন। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা নানা স্লোগান দিচ্ছেন। ‘আমরা সবাই হাদি হব যুগে যুগে লড়ে যাব’, ‘হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ইত্যাদি স্লোগান দিচ্ছেন তারা।

দুপুর ১টার মধ্যে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার দুটি বড় মাঠ মানুষে মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মানুষের ভিড় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর বিশাল রাজপথ ছাপিয়ে ফার্মগেটের খামারবাড়ি ও আসাদগেট পর্যন্ত চলে যায়। উত্তর দিকে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্তও ছিল মানুষ আর মানুষ।

দুপুর আড়াইটায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শহীদ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার বড় ভাই জানাজায় ইমামতি করেন। রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে ওসমান হাদিকে গুলি করার পর তার হত্যাকারীরা কীভাবে পালিয়ে গেল এই প্রশ্ন তুলেন শরিফ ওসমান হাদির ভাই আবু বকর সিদ্দিক। জানাজার আগে দেয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

আবু বকর সিদ্দিক বলেন, সাত থেকে আটদিন পেরিয়ে গেলেও হত্যাকারীদের ধরা সম্ভব হলো না কেন? ওসমান হাদির হত্যাকারীদের বিচার যেন দ্রুত নিশ্চিত করা হয় সেই দাবিও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, “আমার ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল শরিফ ওসমান হাদি, আজকে তার লাশ বহন করতে হচ্ছে।”

শরিফ ওসমান বিন হাদির জানাজার আগে দেয়া বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা বলেন,‘বীর ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছ এবং চিরদিন বাংলাদেশ যত দিন আছে, তুমি সব বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে। এটা কেউ সরাতে পারবে না।’

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমরা আজকে তোমাকে প্রিয় হাদি, বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি, তুমি যা বলে গেছ, সেটি যেন আমরা পূরণ করতে পারি।’ দেশের মানুষ হাদির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ইউনূস। এটি যেন সবার মনে সব সময় জাগ্রত থাকে, সবাই যেন অনুসরণ করতে পারে বলেন তিনি।

অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, হাদি এমন এক মন্ত্র কানে দিয়ে গেছে, যা দেশের মানুষ কোনো দিন ভুলতে পারবে না। চিরদিন কানে বাজতে থাকবে। বড় মন্ত্র হিসেবে জাতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। হাদির মন্ত্র ছিল,  চির উন্নত মম শির। সেই শির কখনো নত হবে না। সেই মন্ত্র সব কাজে প্রমাণ করা হবে। বাংলাদেশ দুনিয়ার কাছে মাথা উঁচু করে চলবে, কারও কাছে মাথা নত করবে না। সেই মন্ত্র পূরণ করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘প্রিয় হাদি, তুমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলে। এবং সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নির্বাচন কীভাবে করতে হয়, তারও একটা প্রক্রিয়া জানিয়ে গেছ আমাদের। কীভাবে প্রচার-প্রচারণা কার্য চালাতে হয়, কীভাবে মানুষের কাছে যেতে হয়, কীভাবে মানুষকে কষ্ট না দিয়ে তার বক্তব্য প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে বিনীতভাবে মানুষের কাছে আসতে হয়, সবকিছু তুমি শিক্ষা দিয়ে গেছ। আমরা এই শিক্ষা গ্রহণ করলাম। আমরা এই শিক্ষা চালু করতে চাই। আমরা সবাই যে আমাদের জীবনে, আমাদের রাজনীতিকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই, যাতে হাদি আমাদের জীবনে স্পষ্টভাবে জাগ্রত থাকে।’

অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘হাদি তুমি হারিয়ে যাবে না, কোনো দিন, কেউ তোমাকে ভুলতে পারবে না। তুমি যুগ যুগ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকবে। আমাদের তোমার মন্ত্র পুনঃপুন মনে করিয়ে দেবে। আমরা তোমাকে মনে করিয়ে দেব, চির উন্নত মম শির। আমরা সেই মন্ত্র নিয়ে আজকে সামনের পথে এগিয়ে যাব। তোমাকে আমাদের সবার পক্ষ থেকে, সবার পক্ষ থেকে তোমার সঙ্গে ওয়াদা করলাম, আজকে তোমাকে আল্লাহর হাতে আমানত রেখে গেলাম। আমরা সব সময় তোমার কথা স্মরণ রেখে জাতির অগ্রগতির পথে চলতে থাকব।’

এদিকে হাদির দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর বিকালে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে জড়ো হন বহু মানুষ। সেখান থেকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়া হয়েছে। আল্টিমেটাম দিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, “আগামীকাল বিকাল সোয়া ৫টার মধ্যে শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জবাব না এলে আবারও শাহবাগে অবস্থান নেয়া হবে।” একইসঙ্গে শাহবাগ মোড়ের নামকরণ পরিবর্তন করে ‘হাদি চত্বর’ করার আহ্বান জানানো হয়।

এদিন, বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে শাহবাগ মোড়ে মানুষ জড়ো হওয়া শুরু করেন। তখন শাহবাগে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। হাদির দাফন শেষ হওয়ার পর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শাহবাগে সমাবেশ আরও বিশাল আকার ধারণ করে।

প্রসঙ্গত, গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রিকশায় থাকা হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গুলিটি তার মাথায় লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

পর দিন ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টা ৩ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে শহীদ হাদির মরদেহবাহী এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাদির মরদেহ বহনকারী ফ্লাইটটি অবতরণ করে।