রাজসিক মহাপ্রত্যাবর্তন তারেক রহমানের

জনতার মঞ্চে রাজনীতির জীবন্ত উপন্যাস

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৫, ২০২৫, ১১:৫৪ পিএম
  • দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনের অবসান, লাখো-কোটি জনতার ভালোবাসায় সিক্ত তারেক রহমান
  • জনস্রোত পার হয়ে জনসমুদ্রে তারেক রহমান, মায়ের জন্য প্রগাঢ় আবেগ দোয়া প্রার্থনা
  • বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে প্রথমেই দেশের মাটির স্পর্শ মার্টিন লুথার কিংয়ের অমর বাণীর সঙ্গে সুরে সুর মিলিয়ে আই হ্যাভ এ প্ল্যান

‘ও ভাই  খাঁটি  সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি
এই দেশেরই মাটি জলে
এই দেশেরই ফুলে ফলে
তৃষ্ণা মিটাই মিটাই ক্ষুধা
পিয়ে এরি দুধের বাটি
এই মায়েরই প্রসাদ পেতে
মন্দিরে এর এঁটো খেতে
তীর্থ ক’রে ধন্য হতে আসে কত জাতি।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আমার দেশের মাটির এই কবিতার পঙক্তির চিত্র ভেসে উঠল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তনের দিন। প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসন ভেঙে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে প্রথমেই দেশের মাটির স্পর্শ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 

ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে এসে খোলা জায়গায় জুতো খুলে দেশের মাটি আর শিশির ভেজা ঘাসের স্পর্শ নেন তারেক রহমান। এ সময় এক টুকরো মাটি হাতে নিয়ে মাতৃভূমির স্পর্শ নিতে দেখা যায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে। 

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৪৩ মিনিটে তাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২০২ ফ্লাইটটি ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। শাহজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তারেক রহমানকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানিয়ে এবং আলিঙ্গনে-করমর্দনে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। 

এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ড. আব্দুল মঈন খান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু) ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনও উপস্থিত ছিলেন বিমানবন্দরে। 

দেশের মাটিতে পা রেখেই বিমানবন্দর থেকে ফোনালাপে সবধরনের সহযোগিতার জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ধন্যবাদ জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিমানবন্দর থেকে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান সরাসরি যান গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসায়।

অন্যদিকে বিমানবন্দর থেকে বিএনপি আয়োজিত সভাস্থলে যান তারেক রহমান। লালসবুজ রঙে সাজানো একটি বাসে করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলে তার জন্য প্রস্তুত গণসংবর্ধনাস্থলে পৌঁছান তিনি। এ সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশবাসীর বিপুল ভালোবাসায় অভিষিক্ত হন। রাস্তার দুই পাশে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। তারেক রহমান হাত নেড়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিমানবন্দর থেকে রওনা হওয়ার প্রায় ৩ ঘণ্টা পর তিনি সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে উপস্থিত ছিল লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক। 

সরেজমিন দেখা যায়, সংবর্ধনা মঞ্চে তারেক রহমানের কণ্ঠে বিসমিল্লাহ শুনতেই চারদিকে লাখ লাখ জনতার উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে। উপস্থিত জনতার ‘তারেক রহমান বীরের বেশে, এসেছে ফিরে বাংলাদেশে’ স্লোগানে মুখরিত ছিল সংবর্ধনা স্থল। 

এদিকে তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে (তিনশ ফিট সড়ক) জনসমুদ্রে পরিণত হয় সকাল থেকেই। কুড়িল বিশ্বরোড থেকে শুরু করে সংবর্ধনা মঞ্চ পর্যন্ত পুরো সড়ক ছিল নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মী রাতেই সমাবেশস্থলে অবস্থান নেন। অনেকেই রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে। মঞ্চ আর আশপাশের এলাকায় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল- ‘জনাব তারেক রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’। সংবর্ধনাস্থলের বাইরেও নেতাকর্মীদের ঢল ৩০০ ফিট ছাড়িয়ে বিমানবন্দর সড়ক ও উত্তরা-বনানী এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অনুষ্ঠান সফল করতে সংবর্ধনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় ৯ শতাধিক মাইকের ব্যবস্থা করা হয়। 

পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডিজিটাল এলইডি ডিসপ্লে বসানো হয়। মঞ্চের সামনে এবং দুই পাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৫ থেকে ৩০ ফুট দূরত্বে বিশেষ ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়। মঞ্চে রয়েছে ১৯টি চেয়ার। মঞ্চের চারপাশে সতর্ক অবস্থানে ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। 

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে তিনি সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন এবং হাত নেড়ে উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় জড়ো হওয়া বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীও ব্যারিকেডের বাইরে দাঁড়িয়ে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানান। হাত নেড়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। গণসংবর্ধনাস্থলের মঞ্চে উঠে নিজের জন্য বরাদ্দ বিশেষ চেয়ার সরিয়ে রেখে সাধারণ একটি চেয়ার টেনে সেটাতে বসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 

প্রথমে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এরপর স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। এরপরই বক্তৃতা শুরু করেন দেড় যুগ বাদে দেশে ফেরা তারেক রহমান। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া চান তারেক রহমান। এ সময় মায়ের জন্য প্রগাঢ় আবেগ ফুটে ওঠে তার কণ্ঠে। 

দেশবাসীর কাছে মায়ের জন্য দোয়া চেয়ে তারেক রহমান বলেন, সন্তান হিসেবে আমার মন হাসপাতালে শুয়ে থাকা আমার মায়ের বিছানায় পড়ে আছে। আমি এখান থেকে আমার মায়ের কাছে যাবো। সবাই দোয়া করবেন, যেন তিনি সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসতে পারেন। সমাবেশ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমান মার্টিন লুথার কিংয়ের অমর বাণীর সাথে সুরে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’।

দেশবাসীর উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রিয় ভাই-বোনেরা, মার্টিন লুথার কিং নাম শুনেছেন না আপনারা? নাম শুনেছেন তো আপনারা? মার্টিন লুথার কিং, তার একটি বিখ্যাত ডায়ালগ আছে- ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’। আজ এই বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনাদের সবার সামনে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সদস্য হিসেবে আপনাদের সামনে আমি বলতে চাই, আই হ্যাভ এ প্ল্যান;  ফর দি পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি। আজ এই পরিকল্পনা দেশের মানুষের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য; যদি সেই প্ল্যান, সেই কার্যক্রম, সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করতে হয়- প্রিয় ভাই-বোনেরা, এই জনসমুদ্রে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, এই সারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের শক্তি যত মানুষ উপস্থিত আছেন; প্রত্যেকটি মানুষের সহযোগিতা আমার লাগবে। আপনারা যদি আমাদের পাশে থাকেন, আপনারা যদি আমাদেরকে সহযোগিতা করেন, ইনশাআল্লাহ আমরা ‘আ হ্যাভ এ প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হব। 

তারেক রহমান বলেন, ‘২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে, একাত্তরের স্বাধীনতা অর্জনের মতো ছাত্রজনতা, কৃষক শ্রমিক দলমত নির্বিশেষে সবাই স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে। একাত্তর সালে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, চব্বিশের ৫ আগস্ট সে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে। মানুষ গণতন্ত্র ফিরে পেতে চায়। সবাই মিলে দেশ গড়ার সুযোগ এসেছে।’

 সমাবেশস্থলে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে তারেক রহমান তার মা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে যান। সেখানেও তারেক রহমানকে একপলক দেখতে ভিড় করেন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ।

হাসপাতালের সামনে দলীয় নেতাকর্মীদের কেউ কেউ তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত টিশার্ট পরে ও দলীয় পতাকা হাতে অবস্থান করেন। হাসপাতালের সামনে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে তারেক রহমান এভারকেয়ারে পৌঁছান। 

এর আগে বিকেল ৫টা ১০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানও এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছান। মা খালেদা জিয়াকে দেখে এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর বের হন তারেক রহমান। সেখান থেকে গাড়িবহর নিয়ে তিনি তার গুলশানের বাসভবনে যান।

তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাড়িটিও নতুন করে সাজানো হয়। তারেক রহমানকে পুলিশি নিরাপত্তাসহ বিশেষ সুরক্ষা দেয়া হচ্ছে। তার বাসভবন ও কার্যালয়েও থাকবে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়া কাউকে তার কাছে যেতে দেয়া হবে না।