নিষিদ্ধ গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৬, ১১:৫৮ পিএম
  • কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা, আগাম ফাঁস হচ্ছে পাঠ্যবইয়ের গোপন তথ্য
  • আইন আছে, প্রয়োগ নেই। নিষিদ্ধ-জরিমানা-দণ্ডের বিধানেও এ ব্যবসা হচ্ছে প্রকাশ্যে
  • বিলম্বে পাঠ্যবই ছাপানোর পেছনেও কাজ করছে এ নিষিদ্ধ বাণিজ্য

উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও আইনগত শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও দেশে নোট ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা থামছে না। সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে উচ্চ আদালতের এক আদেশে নোট ও গাইড বই প্রকাশ, বিপণন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। তবে বাস্তবে এই আইন কার্যকর করার তেমন কোনো নজির নেই। প্রতি বছর জানুয়ারির শুরুতেই দেশের বিভিন্ন বইয়ের বাজার ও শিক্ষা উপকরণ বিক্রির দোকানে সরকার নিষিদ্ধ নোট-গাইড বইয়ের ছড়াছড়ি দেখা যায়। 

‘একের ভেতর সব’, ‘শর্ট নোট’, ‘কমন সাজেশন’- এমন নানা নাম ব্যবহার করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শ্রেণির জন্য এসব বই প্রকাশ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মূল পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর আগেই গাইড বই বাজারে চলে আসে, যা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

নিষিদ্ধ থাকার পরও দেশে বছরের পর বছর ধরে নোট ও গাইড বইয়ের রমরমা ব্যবসা চলছে প্রকাশ্যেই। নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইড বই প্রকাশ, বিপণন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি একই সঙ্গে আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা আইন রয়েছে দেশে। তবে বাস্তবে এই আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব ও একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদে কয়েকটি ছাপাখানা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ধরে গাইড-সহায়ক বই ছাপিয়ে অবাধে বাজারজাত করে আসছে।

প্রতি বছর ১ জানুয়ারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে সরকার। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অনুমোদন ব্যতীত পাঠ্য তালিকায় অন্য কোনো বই ব্যবহারের সুযোগ নেই এমন স্পষ্ট বিধানও রয়েছে। তা সত্ত্বেও বছরের শুরুতেই দেশের প্রায় সব বড় বইয়ের বাজার, ফুটপাত ও শিক্ষা উপকরণ বিক্রির দোকানে দেখা যায় নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ের ছড়াছড়ি। অনেক ক্ষেত্রে মূল পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর আগেই এসব নিষিদ্ধ বই বাজারে চলে আসে, যা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে পাঠ্যবইয়ের কনটেন্ট কোথা থেকে পাচ্ছে গাইড প্রকাশকরা?

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে প্রতি বছর সময়মতো পাঠ্যবই বিতরণে ব্যর্থতার নেপথ্যে রয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ নোট-গাইড বইয়ের বিশাল বাণিজ্য। টানা ১৫ বছর ধরে জানুয়ারি মাসে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতে পারেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। মার্চ-এপ্রিলের আগে পূর্ণ সেট বই পাওয়াই এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মার্চের আগে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা সব বই পাবে কি না্ততা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

অন্যদিকে, বছরের শুরুতেই বাজারে ভরে উঠেছে সরকার নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ে। মূল পাঠ্যবই না পেলেও শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে গেছে নানা গাইড বই। 

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অবৈধ গাইড বইয়ের এই হাজার কোটি টাকার বাজার টিকিয়ে রাখতেই পরিকল্পিতভাবে পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহে বিলম্ব ঘটানো হয়। এনসিটিবির ভেতরের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা এবং কিছু প্রভাবশালী প্রকাশনা ও প্রেস মালিকের যোগসাজশে পাঠ্যবইয়ের কনটেন্ট, সিলেবাস ও নম্বর বণ্টনের তথ্য আগাম ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এনসিটিবির একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে নোট-গাইড ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকটি প্রেস ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দীর্ঘদিনের যোগসাজশ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পাঠ্যবই মুদ্রণের আগে ব্যবহূত ‘র কপি’ বা সিডি, অধ্যায়ভিত্তিক নম্বর বণ্টন, সম্ভাব্য সৃজনশীল প্রশ্ন কাঠামো এবং সিলেবাসের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের আগাম তথ্য মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব প্রেস মালিকদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে।

বেশ কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘একের ভেতর সব’ বা ‘অল ইন ওয়ান’ নামে গাইড বই প্রকাশ করছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে একটি বইতেই রয়েছে পাঠ্যবইয়ের সারসংক্ষেপ, সৃজনশীল প্রশ্নোত্তর, বহুনির্বাচনী প্রশ্ন, সাজেশন ও পরীক্ষার কমন প্রশ্ন। এসব বইয়ের প্রচ্ছদে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকরভাবে এমনভাবে নকশা করা হয়, যাতে সাধারণ

অভিভাবক বা শিক্ষার্থী মনে করেন এটি এনসিটিবি অনুমোদিত কোনো সহায়ক বই। গ্যালাক্সি, লেকচার, অনুপম, জননী, জুপিটার, আদিল, দিগন্ত, ক্যামব্রিয়ান, গ্লোবাল, ক্লাস ফ্রেন্ড, অ্যাপোলো, সংসদ, ক্যাপ্টেন, সুপার, ছাত্রকণ্ঠ পাবলিকেশন্সসহ শিক্ষকরা ৫০টিরও বেশি পাবলিকেশন্সের নিয়মিত নোট বই ও গাইড প্রকাশ হয়ে আসছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বই শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা সৃজনশীল শিক্ষাব্যবস্থার মূল দর্শনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। শিক্ষার্থীরা মূল বই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার আশায় গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এদিকে আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই এই অবৈধ ব্যবসা থামাতে।

উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী গাইড ও নোট বই প্রকাশ ও বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এরপরও বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবসা বহাল তবিয়তে চলছে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালালেও তা সীমিত পরিসরে এবং সাময়িক। অভিযানের পর কিছুদিন বাজারে গাইড বই কম দেখা গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আবার আগের মতোই ফিরে আসে।

একজন প্রকাশনা ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নোট-গাইডের বাজার শত কি হাজার কোটি টাকার। এই টাকার ভাগ নানা জায়গায় যায়। তাই অভিযান হলেও বড় খেলোয়াড়রা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।”

এদিকে অভিভাবকদের একটি বড় অংশ বাধ্য হয়েই এসব গাইড বই কিনছেন। রাজধানীর একটি নামী স্কুলের অভিভাবক মোস্তাফিজ আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, “ আমার বড় ছেলে ক্লাস নাইনে পড়ে, ছোটটা পড়ে সেভেনে। স্কুলে শিক্ষকরা সরাসরি গাইড বই কিনতে বলেন না, কিন্তু ইঙ্গিতে বোঝানো হয় গাইড না পড়লে পরীক্ষায় ভালো করা কঠিন।”

অন্যদিকে অনেক শিক্ষক বলছেন, গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্যে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।শিক্ষাবিদরা বলছেন, নোট-গাইড বইয়ের দৌরাত্ম্য শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর করে তুলছে এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ব্যাহত করছে। তাদের মতে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব নয়।