জুলাই গণ-অভ্যুথানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার বিপরীত চিত্রই স্পষ্ট হচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক সহিংসতা, সংঘর্ষ, হামলা ও প্রাণহানির ঘটনা। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। গত ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জনেরও বেশি নেতাকর্মী। আহত হয়েছেন অসংখ্য। সংঘর্ষ, ককটেল বিস্ফোরণ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং হুমকি-ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনায় নির্বাচনি পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে একাধিক স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও হামলা ও পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দিলেও সহিংসতার রেশ কাটছে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
রাজধানী ঢাকাতেও নির্বাচনি সহিংসতার ছায়া পড়েছে। গত মঙ্গলবার ঢাকা-৮ আসনে এনসিপি প্রার্থী নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারির গণসংযোগ চলাকালে হামলার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গণসংযোগের সময় হঠাৎ করেই একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালায়। এ হামলার ঘটনায় জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শুধু দলীয় সংঘর্ষই নয়, নির্বাচনি সময়কে কেন্দ্র করে মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ সহিংসতার ঘটনাও বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় সন্দেহভাজন বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে মানুষকে মারধর করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব ঘটনা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।
নির্বাচনি সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ভোটাররাও। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সহিংস পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়া নিরাপদ হবে কি না। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ভোটারদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। সম্প্রতি ভোট চাওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব হামলাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ-মিছিল ও উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশজুড়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের এই অনিশ্চয়তা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটের মধ্যে, যেখানে লেবার পার্টিসহ একাধিক দল অংশ নিয়েছে।
নির্বাচনি মাঠে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যে কথার লড়াই দিন দিন তীব্র হচ্ছে। জনসভা, গণসংযোগ ও নির্বাচনি প্রচারণায় একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কথার লড়াই অনেক জায়গায় আর কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; কোথাও কোথাও তা সরাসরি সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের দিন সারা দেশে পুলিশের বিভিন্ন থানায় ব্যাপক ভাঙচুরের পাশাপাশি অস্ত্র ও গুলি লুটের ঘটনা ঘটে। সে সময় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়। যদিও পরবর্তীতে যৌথ অভিযান চালিয়ে এসব অস্ত্রের একটি অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তবে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্র নির্বাচনি সহিংসতায় ব্যবহূত হতে পারে। বিশেষ করে ভোটের দিন বা তার আগের সময়কে ঘিরে সহিংসতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে তারা মনে করছেন। মব ভায়োলেন্স ও রাজনৈতিক সংঘর্ষের সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করা। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা ঠেকাতে কঠোর নজরদারির কথা বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলোর সংযম ও দায়িত্বশীল আচরণ ছাড়া এই নির্বাচনকে সহিংসতামুক্ত রাখা কঠিন হবে।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
নির্বাচন কমিশন বলছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনই তাদের প্রধান লক্ষ্য। যে কোনো ধরনের সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করা হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নিরাপত্তা জোরদার করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নির্বাচনকালীন সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। সহিংসতা বন্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা কঠিন।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। উৎসবের বদলে সহিংসতার খবরই বেশি চোখে পড়ছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষায় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।