টালমাটাল পুঁজিবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ১২:০৩ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের ফলে জ্বালানি বাজার থেকে পুঁজিবাজার পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক কার্যক্রমের প্রতিক্রিয়ায় ইরান ও মিত্র শক্তির পাল্টা হামলার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তেলের দাম বাড়ছে, গ্যাসের মূল্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে এবং পুঁজিবাজারে বড় পতন দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এই ধাক্কা কেবল শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ নয়, সম্পূর্ণ বাজার কাঠামোতে এক জটিল ঝঞ্ঝা সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রত্যেক লেনদেন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং ভ্যালুয়েশন রেটিংয়ের ওপর। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা অর্থনৈতিক অটল কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং ভবিষ্যতেও অস্থিরতা আরও দীর্ঘ সময় পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

তেলের দাম আকাশচুম্বি

বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম গত কয়েক সপ্তাহে ব্যাপক উত্থান দেখিয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১৪% বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল বুধবার সকালের লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আরও ১.২% বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২.৪৫ ডলারে পৌঁছেছে, এটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ স্তর।

বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য যেহেতু অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে, তাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে দাম আরও ওঠা-নামা করবে। বিশেষ বিশেষ বাজার বিশ্লেষক মনে করেন, এমন অস্থির পরিস্থিতিতে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো মাল্টিলেটারাল আলোচনার মাধ্যমে নীতি নির্ধারণ না করলে মূল্য নীতির ওপর বড় ধাক্কা আসতে পারে।

গ্যাসের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী, ইউরোপে সংকট

বিশ্বের গ্যাস বাজারও সরাসরি প্রভাবিত হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় গ্যাসের দাম প্রায় ৭০% বৃদ্ধি পেয়েছে, একটি বিরাট লাফ। এর পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কাতারের বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) রপ্তানিকারকের কারখানা সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালীর আশঙ্কাজনক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যেখানে বিশ্বের প্রায় ২০% তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। সেখানকার উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

বিশ্ব প্ল্যান্ট ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, এলএনজি সরবরাহে এই রকম ফাটল অর্থনীতিতে রেসেসন ফোর্স করতে পারে এবং ইউরোপের শীতের মরসুমে গ্যাসের চাহিদা আবার বাড়লে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হতে পারে।

পুঁজিবাজারে বড় পতন

জ্বালানি সংকট ও ভ্রাম্যমাণ রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে বিশ্ব পুঁজিবাজারে বড় ধাক্কা পড়েছে। রাজধানী বাজারগুলোয়ের সংশ্লিষ্ট লেনদেনে দ্রুত পতন দেখা গেছে- দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক প্রায় ৮% কমেছে, জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক প্রায় ৩.৬% পতন, অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ প্রায় ১.৮% কমেছে।

বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকছেন, অর্থাৎ ডলারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত ডলারের সূচকটি প্রায় ০.২% বৃদ্ধি পেয়ে ৯৯.২৮ তে পৌঁছেছে, গত তিন মাসে সর্বোচ্চ মান। এর বিপরীতে ইউরো ও ব্রিটিশ পাউন্ডের মান কমে গেছে- ইউরোর মান প্রায় ০.৩% কমে ১ ডলারে ১৫ সেন্টে, ব্রিটিশ পাউন্ড প্রায় ০.৩% কমে ১ ডলারে ৩৩ সেন্টে। বিশ্লেষকরাও বলছেন, ঋণপত্রে আগ্রহ বাড়লে এবং নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের চাহিদা বাড়লে পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক লিকুইডিটি ও প্রচলিত বিনিয়োগের ওপর বড় প্রভাব পড়বে।

ক্রিপ্টো মুদ্রার উত্থান

যদিও প্রচলিত বিনিয়োগ মাধ্যমগুলোতে চাপ দেখা যাচ্ছে, তবুও ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিটকয়েনের দাম গত লেনদেনে প্রায় ০.৮% বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৬৮,৫৮৫ ডলারে পৌঁছেছে।

ক্রিপ্টো বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় লোকেরা বিকল্প ডিজিটাল সম্পদে ঝুঁকছে এবং বিটকয়েনকে এখন নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যদিও এর ঝুঁকি অন্যান্য স্থিতিশীল সম্পদের তুলনায় বেশি।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা সংকট ও এলএনজি রপ্তানির অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাজারকে অস্থির করে রেখেছে।

বিশ্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সাধারণত জ্বালানি ও নিরাপত্তা খাতে ভীতির কারণে মূল্যশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করে, এটি প্রমাণিত বাস্তবতা। বিশেষজ্ঞরা আরো উল্লেখ করছেন, যদি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতকালের আগে সমাধান না হয়, তবে তেলের দাম আরও উচ্চমাত্রায় যেতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরো গভীর হবে।

অর্থনৈতিক খাতে সাড়া

বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাজারে পতনের পাশাপাশি অনেক দেশ নতুন করে অর্থনৈতিক নীতির পরিকল্পনা করছে। বর্ধিত মূল্যশৃঙ্খল, উচ্চ তেলের দাম ও উচ্চ আগ্রহ হার- এসব মিলিয়ে দামের স্থিতিশীলতা, ঋণের চাপ ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর প্রভাব ফেলছে।

বিশ্ব ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আগেই সতর্ক করেছে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও অস্থিতিশ্চয়তা স্থায়ী হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ধীরগতি হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণের চাপ বাড়বে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মাল্টিলেটারাল আলোচনার জোর, সরবরাহ শৃঙ্খলে স্থিতিশীলতা আনা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগের জরুরি প্রয়োজন।

বাংলাদেশে প্রভাব

বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানির ব্যয় বেড়ে যাবে, যা বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে চাপ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে গাড়ি পরিবহন, কৃষিকাজ ও উৎপাদন খাতে ব্যয় বাড়তে পারে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রস্তুতি নিচ্ছে- সরকারি মজুত, বিকল্প উৎস খোঁজা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করে মূল্য ওঠানামার ধাক্কা সামাল দেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক নীতিমালা জারি করা হবে এবং বাণিজ্য চুক্তিগুলো পর্যালোচনা হবে।

পথে আছে কি সমাধান

বিশ্ব অর্থনীতিতে এই অস্থিরতা খুব দ্রুত শেষ হবে কি না সেটা বলা কঠিন। আন্তর্জাতিক বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক সমাধান জরুরি, তেল ও গ্যাসের স্থায়ী সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়া, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সংহত সমাধান।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করার পিছনে মূল কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। তাই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে অর্থনীতিও স্বাভাবিক পথে ফিরে আসবে।