আমানতকারীদের বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৬, ২০২৬, ১২:২১ এএম

দেশের পাঁচটি শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকের (ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক) আমানতকারীরা গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও করে ব্যাপক আন্দোলন করেছেন। তারা ব্যাংকের হেয়ার কাট প্রক্রিয়া বাতিল করা হলেও চলতি সময়ে শুধু ৪ শতাংশ মুনাফা দেয়া হচ্ছে, তাই সম্পূর্ণ মুনাফা ও আমানত ফেরত পাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

আন্দোলন শুরু হয় সকাল ১০টায়, মতিঝিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে। আমানতকারীরা মানববন্ধন ও সমাবেশের মাধ্যমে তাদের দাবি তুলে ধরেন। বেলা ১২টার দিকে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফটকে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা কর্মীরা তাদের আটকে দেন। আন্দোলনকারীরা ফটকের বাইরে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে গভর্নরের সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত সরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেননি।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য : আন্দোলনের মুখপাত্র আলিফ রেজা গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমাদের এখন শুধু ৪ শতাংশ মুনাফা দেয়া হচ্ছে, যা আমরা মানি না। পুরো মুনাফা চাই, সব টাকা দ্রুত ফেরত দিতে হবে। গভর্নরকে স্মারকলিপি দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তা দেয়া হয়নি।’ আরেক আন্দোলনকারী জয়নাল আবেদিন জানান, ‘আমার এক কোটি টাকার এফডিআর আছে। ব্যাংক শুধু চার লাখ টাকা মুনাফা দিতে চাইছে। এটা আমি মেনে নিতে পারি না। তাদের তো কর্মচারীরা বেতন, বোনাস ঠিকই নিচ্ছে। আমরা কেন কম মুনাফা পেতে যাচ্ছি?’

আন্দোলনকারীদের দাবির মূল কারণ হলো হেয়ার কাট পদ্ধতি বাতিল হলেও সম্পূর্ণ মুনাফা না পাওয়া। গত দুইবছর ধরে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক শুধু ৪ শতাংশ মুনাফা প্রদান করছে। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, তাদের পূর্ণ মুনাফা এবং মূল আমানত দ্রুত ফেরত দেয়া হোক।

পাঁচ ব্যাংকের একীভূত কর্মকাণ্ড

পাঁচটি ব্যাংক ২০২৫ সালে একীভূত হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা দেয়, চলতি অর্থবছরে হেয়ার কাট প্রক্রিয়া বাতিল করা হলেও আমানতের বিপরীতে পূর্ণ মুনাফা দেয়া হবে না। পরবর্তীতে আন্দোলনের মুখে ব্যাংক ৪ শতাংশ মুনাফা দিতে সম্মত হয়। বেসরকারি ব্যাংকের এই একীভূত হওয়ার পেছনে লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আর্থিক খাতের স্বাস্থ্য রক্ষা। তবে এখন আমানতকারীদের দাবি এ ব্যাংকের হিসাব-নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ ফেরতের বিষয় সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কাছে আন্দোলনকারীদের দাবি যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবতা হলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের তাত্ত্বিক ও বাস্তবিক তরলতা সংকট রয়েছে। ব্যাংক সব টাকা ফেরত দিলে তা আর নিজেকে দাঁড়াতে পারবে না। সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দিতে হলে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা প্রয়োজন, অথচ ব্যাংকের হাতে মাত্র ৩৫ হাজার কোটি টাকা মূলধন আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হেয়ার কাট বাতিলের পরে ব্যাংক গত দুই বছরে ৪ শতাংশ মুনাফা প্রদান করছে। আন্দোলনকারীদের দাবি যাচাই-বাছাই করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। দেখা হবে, কি সুপারিশ আসে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই পরিস্থিতিতে অল্প ধৈর্য প্রদর্শন জরুরি। ব্যাংকের তরলতা নিশ্চিত না হলে পুরো অর্থবহ লেনদেন ব্যাহত হতে পারে। সরকারের তদারকিতে ব্যাংক ক্রমশ নিজেকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।

আন্দোলনের প্রভাব ও সমর্থন

অন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফটক ঘিরে অবস্থান নিয়ে জনমতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলনকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করেছেন, আন্দোলনটি এখনও কার্যকরভাবে চলমান।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, হেয়ার কাট বাতিল হলেও ৪ শতাংশ মুনাফা দেয়ার প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তরলতার সীমাবদ্ধতা, পুরো অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। তারা বলছেন, সরকারি তত্ত্বাবধানে ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও আমানতকারীদের দাবির সমাধান দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

আর্থিক বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব এবং বাজারের আস্থা বজায় রাখতে চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ‘অর্থপ্রদান প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা না হলে, বিদেশি বিনিয়োগ ও দেশের আর্থিক বাজারে আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাঁচ ব্যাংকের একীভূত প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের দাবির মধ্যে রাজনৈতিক ও আর্থিক সংযোগ থাকতে পারে। তাই এই সমস্যা সমাধান করার জন্য সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

সম্ভাব্য সমাধান

  • স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই : আন্দোলনকারীদের দাবি যাচাই করে, যথাযথ পরিমাণ মুনাফা প্রদান নিশ্চিত করা।
  • মূলধন বৃদ্ধির পরিকল্পনা : ব্যাংকের তরলতা ও মূলধন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা।
  • সরকারি তদারকি : রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে ব্যাংকের কার্যক্রম এবং মুনাফা বিতরণ পর্যবেক্ষণ।
  • অস্থায়ী সমাধান : আমানতকারীদের অর্ধেক বা পর্যায়ক্রমিক মুনাফা প্রদান করে ধৈর্যধারণের সুযোগ দেয়া।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের আর্থিক বাজারে এই ধরনের বেসরকারি ব্যাংকের সমস্যা এবং আন্দোলন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ও তরলতা নিশ্চিত না হলে, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি বিবেচনায় দেশে বিনিয়োগ কমাতে পারে।

জনগণের প্রতিক্রিয়া

আন্দোলন চলাকালীন সময়, সাধারণ জনগণ ও ছোট বিনিয়োগকারীরাও সমর্থন প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, আন্দোলনকারীরা ব্যালকনি ও ফটকের বাইরে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে তাদের দাবির কথা তুলে ধরছেন। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, ব্যাংকের তরলতা সীমিত হলেও আমানতকারীর দাবি যৌক্তিক।

পাঁচটি ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরত ও পূর্ণ মুনাফা প্রক্রিয়ার সমস্যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে এসেছে। আন্দোলনকারীরা মানববন্ধন ও ফটক ঘেরাও করে সরকারের প্রতি তাদের দাবির জোরালো বার্তা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা থাকায় সম্পূর্ণ মুনাফা ও আমানত এখনই দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু ধৈর্য এবং তদারকির মাধ্যমে সমস্যা সমাধান হবে। তবে আন্দোলনকারীরা তাদের মূল দাবির প্রতি অটল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের জন্য সময় এসেছে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং স্থিতিশীল সমাধান প্রদানের। নইলে শুধু ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হতে পারে।