ঋণের জালে ডিএসসিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২৬, ১২:৫১ এএম

রাজধানীর একটি বিশাল অংশের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এখন নিজেই ‘লাইফ সাপোর্টে’। এক সময়ের উদ্বৃত্ত তহবিলের এই সংস্থাটি এখন এতটাই দেউলিয়া যে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক বেতন ও বোনাস পরিশোধ করতে হচ্ছে ধার করা টাকায়। গত দেড় বছরে রাজস্ব আদায়ে ধস এবং রহস্যজনকভাবে বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিল পরিশোধের ফলে সংস্থাটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পড়েছে।

বেতন দিতেও ধার: করুণ দশা নগর ভবনের

ডিএসসিসি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, গত মাসে সংস্থাটির নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ সাধারণ তহবিলে ছিল না। ফলে নিরুপায় হয়ে ঋণ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বোনাস দিতে হয়েছে। প্রতি মাসে বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ডিএসসিসির প্রয়োজন হয় প্রায় ২৫ কোটি টাকা। অথচ বর্তমানে সংস্থার সাধারণ তহবিলে জমা আছে মাত্র ১৬ কোটি টাকা। আগামী মাসের বেতন কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে খোদ ডিএসসিসির শীর্ষ মহলেই চলছে চরম উদ্বেগ।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা: প্রশাসকের আর্তনাদ

সংস্থাটির বর্তমান প্রশাসক ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হয়েছেন। গত ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তিনি গণমাধ্যমকে জানান, গত কয়েক মাসে রাজস্ব আদায়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। তিনি বলেন, “বিগত প্রশাসনের সময় যেভাবে ঢালাওভাবে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে গেলে সিটি করপোরেশন কার্যত ধসে পড়বে।”

রাজস্ব আদায়ে ধস: পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গত ১৯ মাসে ডিএসসিসির রাজস্ব আদায়ের গ্রাফ ক্রমাগত নিচের দিকে নেমেছে।

রেকর্ড বনাম বর্তমান: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংস্থাটি রেকর্ড ১ হাজার ৬১ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল।

ফেব্রুয়ারির চিত্র: অথচ গত ফেব্রুয়ারি মাসে আদায়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৪২ কোটি টাকা, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

লক্ষ্যমাত্রা বনাম অর্জন: ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গত আট মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৬২৫ কোটি টাকা।

কোথায় গেল জমানো টাকা? ‘কমিশন বাণিজ্য’ ও ‘মব’ কালচার

ডিএসসিসির এই অর্থশূন্যতার পেছনে উঠে আসছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, গত ১৯ মাসে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এর বড় অংশই ছিল সাবেক দুই মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের সময় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে আটকে থাকা বিল।

অভিযোগ উঠেছে, প্রকৌশল বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে এসব বিতর্কিত বিল দ্রুত ছাড় করতে সহায়তা করেছেন। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা ‘মব’ তৈরি করে বা বলপ্রয়োগ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে বিল তুলে নিয়েছেন। মাঠপর্যায়ে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলেও বিল পরিশোধের এমন ঘটনা সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে।

সংরক্ষিত তহবিলে হাত দেওয়ার সুযোগ নেই

ডিএসসিসির কাছে বিভিন্ন খাতের সংরক্ষিত তহবিলে (জামানত, রাস্তা খনন ফি, বাজার সেলামি ইত্যাদি) প্রায় ৮৬৯ কোটি টাকা জমা থাকলেও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে সেই টাকা বেতন বা সাধারণ খরচে ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে সাধারণ তহবিলের এই শূন্যতা সরাসরি নাগরিক সেবার ওপর আঘাত হানছে।

হুমকির মুখে নাগরিক সেবা: বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, উন্নয়নের বিল পরিশোধের তোড়জোড় করতে গিয়ে ডিএসসিসি তার আর্থিক ভারসাম্য হারিয়েছে। এর ফলে মশক নিধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাস্তা ও ড্রেনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্ট্রিটলাইটের মতো মৌলিক নাগরিক সেবাগুলো যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

তদন্তের মুখে প্রকৌশল বিভাগ

প্রশাসক আবদুস সালাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, অপ্রয়োজনীয় কাজের কার্যাদেশ এবং আটকে থাকা বিলগুলো তড়িঘড়ি করে পরিশোধের পেছনে সিটি করপোরেশনের ভেতরকার কোনো যোগসাজশ আছে কি না, তা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার নতুন কার্যাদেশ দেয়া থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়ন করার মতো আর্থিক সক্ষমতা ডিএসসিসির নেই বললেই চলে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এই আর্থিক দেউলিয়াত্ব কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি কোটি নগরবাসীর জীবনযাত্রার জন্য এক অশনিসংকেত। দুর্নীতির তদন্ত এবং রাজস্ব আদায়ের নতুন কৌশল গ্রহণ না করলে রাজধানীর একটি বড় অংশ অচিরেই সেবাবঞ্চিত ভাগাড়ে পরিণত হতে পারে।