মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ইরান, ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাত এখন আর কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে। গতকাল বৃহস্পতিবার পাওয়া সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালীতে বিদেশি তেল ট্যাংকারে ভয়াবহ হামলার পর ইরাক তাদের সমস্ত তেল বন্দর কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা ১,৩৯৫ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে বড় একটি অংশই বেসামরিক নাগরিক।
থমকে গেছে জ্বালানি বিশ্ব : ইরাকের বন্দর বন্ধ
ইরাক সরকার গতকাল জরুরি ভিত্তিতে তাদের তেল বন্দরগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দুটি বিদেশি তেল ট্যাংকারে প্রাণঘাতী হামলার পর এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব দাবি করেছে যে, তারা ইরান থেকে আসা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝআকাশে রুখে দিয়েছে।
কুয়েত ও দুবাইয়ে ড্রোন আতঙ্ক
সংঘাতের আঁচ এখন সরাসরি পৌঁছে গেছে পর্যটন ও বাণিজ্যিক নগরীগুলোতে— কুয়েত বিমানবন্দর: কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেশ কয়েকটি ড্রোন আঘাত হেনেছে। দেশটির সিভিল এভিয়েশনকর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। দুবাইয়ে বিস্ফোরণ: দুবাইয়ের আল বাদা এলাকায় একটি ‘ছোটখাটো ড্রোন দুর্ঘটনা’ ঘটেছে বলে জানিয়েছে দুবাই মিডিয়া অফিস। শহরের বাসিন্দারা বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন বলে জানা গেছে। তবে সেখানে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানে ‘কার্পেট বোম্বিং’ ও মানবিক বিপর্যয়
ইরানের উপ-স্বাস্থ্যমন্ত্রী আলী জাফারিয়ান আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনী ইরানের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ‘কার্পেট বোম্বিং’ বা নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করছে।
হাসপাতালে হামলা: গত চার দিনে ইরানে অন্তত ১৪৯টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ৩১টি বড় ক্লিনিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি বড় হাসপাতাল এখন সম্পূর্ণ অকেজো। বেসামরিক নিহত: ইরানের ফারদিস শহরে এক ফল বিক্রেতা ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। জাফারিয়ানের মতে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো অসংখ্য মানুষ আটকা পড়ে আছেন।
ইরানের পাল্টা আঘাত : তেল আবিবে ড্রোন হামলা
ইরানি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ইসরাইলের দুটি বিমানঘাঁটি এবং তেল আবিবে অবস্থিত কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’-এর সদর দপ্তরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে পালমাচিম এবং ওভদা বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা।
যুদ্ধ থামাতে ইরানের তিন শর্ত
সংঘাতের ভয়াবহতার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ বন্ধের জন্য তিনটি শর্ত ঘোষণা করেছেন- ১. ইরানের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে, ২. যুদ্ধের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ বা রেপারেশন দিতে হবে, ৩. ভবিষ্যতে আর কোনো আগ্রাসন চালানো হবে না- এমন আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে থমথমে পরিস্থিতি : সিটিব্যাংক বন্ধ
যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় আমিরাত থেকে নিজেদের কার্যক্রম সাময়িকভাবে গুটিয়ে নিচ্ছে বড় বড় প্রতিষ্ঠান। সিটিব্যাংক ঘোষণা করেছে যে, ১২ থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত আরব আমিরাতে তাদের সমস্ত শাখা বন্ধ থাকবে। মূলত নিরাপত্তা জনিত কারণেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ইরাকে পিএমএফ ঘাঁটিতে বড় হামলা
ইরাকের আনবার প্রদেশে ইরান-ঘনিষ্ঠ ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’-এর অন্তত তিনটি ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। একে যুদ্ধের শুরুর পর থেকে পিএমএফ-এর ওপর চালানো সবথেকে শক্তিশালী হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর জবাবে এরবিল এলাকায় অন্তত ১৭টি ড্রোন দিয়ে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও ইতালির পদক্ষেপ
তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতালি তাদের কৌশলগত রিজার্ভ থেকে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং একটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে রাজপথ, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ছে এভিয়েশন ও জ্বালানি খাত। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় যদি দ্রুত কোনো সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে এই আগুন নেভানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।