ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে স্বস্তির খবর মিলছে। অধিকাংশ কারখানায় ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ঈদের বোনাস দেয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। একই সঙ্গে মার্চ মাসের অর্ধেক বেতনও পরিশোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে অনেক কারখানা।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ জানিয়েছে, এবার বড় ধরনের কোনো বেতন সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার ঘোষিত প্রণোদনা তহবিলের অর্থ ছাড়ে কিছু ব্যাংক ধীরগতিতে কাজ করছে। ফলে অনেক কারখানা মালিক প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ হাতে পাচ্ছেন না। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে আরও কঠোর নজরদারি বাড়ানো।
রপ্তানি কমলেও বেতন সংকট নেই
চলতি অর্থবছরে তৈরি পোশাকশিল্প নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক চাপ- সব মিলিয়ে খাতটির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের প্রায় প্রতিটি মাসেই তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে। শুধু জুলাই মাসে কিছুটা প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও বাকি মাসগুলোতে রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল।
তবে এ পরিস্থিতিতেও শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেতন ও বোনাস পরিশোধের ব্যবস্থা করছেন।
দ্রুত বেতন ও বোনাস পরিশোধের উদ্যোগ
বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান জানিয়েছেন, অধিকাংশ কারখানায় মার্চের প্রথম সপ্তাহেই ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ঈদের বোনাসও দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘চলতি বছর বড় ধরনের কোনো সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আমরা শ্রমিকদের বেতন, বোনাস এবং মার্চ মাসের অর্ধেক বেতনও সময়মতো পরিশোধ করতে পারব বলে আশা করছি।’
ফ্যাক্টরি মনিটরিং জোরদার
বিজিএমইএর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী জানিয়েছেন, বেতন-বোনাস পরিশোধে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে কারখানাগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বোর্ড সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সভাপতিদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিটি কারখানার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। কোথাও যেন শ্রমিকদের বেতন বা বোনাস নিয়ে সমস্যা তৈরি না হয়, সেটিই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’ এই মনিটরিংয়ের ফলে কোনো কারখানায় সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মার্চের অর্ধেক বেতন দেয়ার প্রস্তুতি
ঈদের আগে শ্রমিকদের আর্থিক চাপ কমাতে মার্চ মাসের অর্ধেক বেতন আগাম দেয়ার পরিকল্পনাও নিয়েছে অনেক কারখানা। শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, কমপ্লায়েন্স থাকাবেশিরভাগ কারখানাই খুব শিগগিরই মার্চের অর্ধেক বেতন দিতে শুরু করবে। এতে শ্রমিকদের ঈদ কেনাকাটা ও পারিবারিক খরচ মেটাতে সুবিধা হবে।
প্রণোদনার অর্থ ছাড়ে ব্যাংকের ধীরগতি : সবকিছু ঠিকঠাক চললেও একটি বড় সমস্যা সামনে এসেছে- সরকার ঘোষিত প্রণোদনা তহবিলের অর্থ ছাড়ে ব্যাংকের ধীরগতি। পোশাকশিল্প উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রণোদনার অর্থ ছাড় করতে দেরি করছে। ফলে কারখানা মালিকরা প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যে সেই অর্থ হাতে পাচ্ছেন না।
দেশের শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল ও পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এন জেড টেক্স গ্রুপের কর্ণধার এবং বিটিএমএর সহ-সভাপতি সালেউদ জামান খান বলেন, ‘প্রণোদনার অনেক টাকা এখনো আটকে আছে। যদি এই তহবিলগুলো দ্রুত পাওয়া যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা অনেকটা স্বস্তি পাবেন।’
বিশেষ তহবিল বরাদ্দ : সরকার চলতি অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা হিসেবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে। এই তহবিল তিন ধাপে বরাদ্দ করা হয়েছে এবং মূলত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ ও শিল্পখাতকে সচল রাখতে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি সূত্র বলছে, এই তহবিলের অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে দেয়া হচ্ছে, যাতে উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে অর্থ নিয়ে শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস দিতে পারেন। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক, তবুও পোশাক শিল্পের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন শিল্পটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকার, ব্যাংক এবং শিল্প মালিকদের যৌথ উদ্যোগ থাকলে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব।