বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালুর সম্ভাবনা নিয়ে সমপ্রতি আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি গত রোববার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। তবে শিক্ষাবিদ এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলেছেন, লটারির পরিবর্তে পরীক্ষা পদ্ধতি পুনরায় চালু করা হলে শিশুরা অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপের মুখোমুখি হবে। একই সঙ্গে এটি কোচিং এবং প্রাইভেটের প্রতি নির্ভরতা পুনরায় বৃদ্ধি করবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে।
সংসদে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, বিগত সরকার প্রাথমিক স্তরে ভর্তি কার্যক্রমে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করেছে। যদিও এই পদ্ধতিটি শিক্ষামন্ত্রী তার কাছে সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত মনে করেননি, তবে তিনি জানিয়েছেন যে, আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির পদ্ধতি নির্ধারণের আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সবার অভিমত নেয়া হবে।
শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ : শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু করা হলে পুরনো সমস্যাগুলো পুনরায় উত্থাপিত হবে। মনজুর আহমদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক গণমাধ্যমে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারির পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো। তবে লটারির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন আরও বলেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা নেয়া উচিত নয়। এতে কোচিং ব্যবসার প্রচলন হবে। এই বয়সে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই করা শিক্ষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে যৌক্তিক নয়। ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করা মানে শিশুকে ‘ট্যাগ’ দেয়া যে সে অযোগ্য। এতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রতি মনোভাব নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
অধ্যাপক কামরুল মনে করেন, সরকারি বিদ্যালয়গুলো সমমান বা কাছাকাছি মানের হওয়া উচিত। যদি সব বিদ্যালয় সমমান হয়, তাহলে ভর্তি পরীক্ষার দরকার হবে না। এলাকার শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ এলাকা অনুযায়ী বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। এতে শহরের যানজটও কমবে এবং কমিউনিটি ভিত্তিক সামাজিকতা ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার মতে ভর্তি পরীক্ষা কোনোভাবেই ভালো নয়। লটারিরও বিশেষ দরকার নেই। বরং শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি করে শিক্ষক নিয়োগ ও বিদ্যালয় উন্নত করা প্রয়োজন।’
অতীতের অভিজ্ঞতা : একসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুদের কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হতো। নামি বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য কোচিং এবং প্রাইভেট ক্লাস ছিল সাধারণ ঘটনা। এতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সুবিধাভোগীরা বেশি এগিয়ে থাকত। অপরদিকে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা প্রায়শই নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারত না। এই পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা ও আলোচনা চলেছে।
২০১১ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে লটারির পদ্ধতি চালু করা হয়। পরবর্তী বছর বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। যদিও দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই চলে। ২০২১ সালের করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম চালানো হয়েছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই পদ্ধতি প্রযোজ্য রয়েছে।
লটারির তুলনায় ভর্তি পরীক্ষার ঝুঁকি : শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিশুদের মেধার পার্থক্য এই বয়সে খুব সীমিত। পরীক্ষা পদ্ধতি শিশুদের অযাচিত মানসিক চাপ ও প্রতিযোগিতা তৈরি করবে। এছাড়া কোচিং-প্রাইভেটে নির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে, যা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাণিজ্যিক করে তুলবে। ভর্তি পরীক্ষা মানে শিশুকে একটি ‘ফেল’ বা ‘সফল’ লেবেল দেয়া। এতে শিশুদের মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায় এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
মনজুর আহমদ বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। যারা কোচিং-প্রাইভেটে সুযোগ পায়, তারাই এগিয়ে থাকে। এই ধরনের দাবি উচ্চবিত্ত বা উচ্চাভিলাষী মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রভাবেই আসে। লটারির মাধ্যমে সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়।’
বৈশ্বিক উদাহরণ : বিশ্বের অনেক দেশে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি স্থানীয় বিদ্যালয়ভিত্তিক। এতে প্রাথমিক স্তরে পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য কমে। বড়দের জন্য মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষা থাকতে পারে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি যৌক্তিক নয়।
কোচিং ব্যবসা ও প্রাথমিক শিক্ষা : প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পুনরায় চালু হলে কোচিং ব্যবসা পুনরায় জোরদার হবে। শিশুদের বয়সের তুলনায় শিক্ষার প্রতি চাপ বৃদ্ধি পাবে। এটি শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার কোচিং সুবিধা গ্রহণ করবে, দরিদ্র পরিবার পিছিয়ে থাকবে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়বে।
শিক্ষায় নীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব : শিক্ষাবিদরা প্রাথমিকভাবে নিম্নলিখিত পরিবর্তনের পরামর্শ দেন-
লটারির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাবে। শিক্ষকের মান বৃদ্ধি ও বরাদ্দ বৃদ্ধি: বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষক থাকলে, শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি এলাকার বিদ্যালয় উন্নত করা: যাতে শিশুরা তাদের নিজ এলাকার বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয় মান সমন্বয়: সব বিদ্যালয় সমমান হলে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার প্রয়োজন পড়বে না। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য: পরীক্ষার চাপ কমানো এবং শিক্ষাকে আনন্দময় ও প্রাসঙ্গিক করে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মত : ডাক্তার কামরুল হাসান বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা শিশুদের ওপর ট্রমা তৈরি করতে পারে। এটি শিক্ষার প্রাথমিক আনন্দ নষ্ট করে। আমাদের উচিত শিশুদের প্রাকৃতিক কৌতূহল ও মেধা বিকাশের সুযোগ দেয়া।’
মনজুর আহমদ আরও বলেন, ‘উচ্চবিত্ত পরিবার ও কোচিং ব্যবসার প্রভাব শিশুদের শিক্ষায় অসমতা বৃদ্ধি করছে। লটারির মাধ্যমে সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে সহায়তা করে।’
সর্বোপরি, বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লটারির মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম কার্যকর। তবে শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলছেন, পরীক্ষা পদ্ধতি পুনরায় চালু হলে শিশুদের ওপর মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাবে, কোচিং ব্যবসা জোরদার হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য বাড়বে। তাই এই বিষয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার মান, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমতা নিশ্চিত করতে বর্তমান লটারির পদ্ধতি উন্নত করা এবং স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন করা শিক্ষাবিদদের মূল পরামর্শ।