রাজধানীর কলেজগেট এলাকায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার নামে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে। গতকাল মঙ্গলবার মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে অবস্থিত পাঁচটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে একাধিক গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষ। অভিযানের পর টিজি হাসপাতাল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি একাধিক প্রতিষ্ঠানের আইসিইউ ও এনআইসিইউ কার্যক্রম ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় স্থগিত করা হয়েছে।
অভিযান চলাকালে যা পাওয়া গেছে : গতকাল সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আভিযানিক দল কলেজগেট এলাকার মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে পৌঁছে বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালের কার্যক্রম পরিদর্শন করে। সেখানে চিকিৎসা সেবার মান, লাইসেন্স, অবকাঠামো, ল্যাব সুবিধা এবং জনবল যাচাই করা হয়। অভিযানে দেখা যায়, অনেক প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ল্যাবরেটরি না থাকলেও রোগীদের ভুয়া প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট দেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ছাড়াই রোগী ভর্তি করা হচ্ছে এবং চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
আইসিইউতে চিকিৎসকহীন শিশু রোগী : টিজি হাসপাতালে অভিযানের সময় এনআইসিইউতে চারটি শিশু ভর্তি থাকলেও কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে। এমনকি প্রেসক্রিপশনে চিকিৎসকের স্বাক্ষরও পাওয়া যায়নি। এই ঘটনাকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলছেন, এ ধরনের অব্যবস্থাপনা সরাসরি রোগীর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
দালাল চক্রের মাধ্যমে রোগী আনা : অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিছু অ্যাম্বুলেন্স চালক ও দালাল চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীদের ভুল বুঝিয়ে এসব হাসপাতালে আনা হয়। সরকারি হাসপাতালে ভিড় বা চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কথা বলে রোগীদের প্রলুব্ধ করা হয় বেসরকারি এসব ক্লিনিকে। এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল এখানে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যাবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারি এখানে চিকিৎসার মান খুবই দুর্বল এবং অনেক অনিয়ম রয়েছে।’
ভুয়া রিপোর্ট ও অবৈধ ল্যাব : একই ভবনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান প্রাইম হাসপাতাল-এ কোনো বৈধ ল্যাব না থাকলেও রোগীদের ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ ধরনের ভুয়া রিপোর্ট রোগ নির্ণয়ে মারাত্মক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং রোগীর চিকিৎসা ঝুঁকির মুখে ফেলে।
স্পর্শকাতর রোগীদের গোপন চিকিৎসা : অভিযানে আরও পাওয়া গেছে, গুলিবিদ্ধ বা সংঘর্ষে আহত রোগীদের মতো স্পর্শকাতর ও আইনি জটিলতাসম্পন্ন রোগীদের গোপনে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। এসব ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলেন, এটি আইন ও নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
একাধিক প্রতিষ্ঠান ও ব্লাড ব্যাংক বন্ধ : অভিযান শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক আবু হোসেন মঈনুল আহসান বলেন, ‘আমরা একাধিক ক্লিনিক ও আইসিইউ বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি পেয়েছি। একটি ব্লাড ব্যাংকও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, মহাপরিচালকের নির্দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং লাইসেন্স যাচাইসহ আইনগত পদক্ষেপ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা : এদিকে স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতে যে অনিয়ম জমে আছে, তা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তবে আমরা পরিবর্তনের যাত্রা শুরু করেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।’
রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ : কলেজগেট এলাকার এই অভিযানের পর সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই এখন হাসপাতাল বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হচ্ছেন। একজন স্বজন বলেন, ‘এতদিন বুঝতে পারিনি কোন হাসপাতাল ভালো আর কোনটা নয়। এখন অভিযান হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছি, তবে আরও কঠোর নজরদারি দরকার।’
বিশেষজ্ঞদের মতামত : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে নিয়ন্ত্রণ ও মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি জরুরি। শুধুমাত্র অভিযান নয়, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
তাদের মতে, রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো, জনবল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়মিত যাচাই করা উচিত।
সামনে কী হতে পারে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই ধরনের অভিযান চলমান থাকবে। যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়ম মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। সব মিলিয়ে কলেজগেটের এই অভিযান রাজধানীর বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যতে খাতটির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।