রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে রোগীর ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামপ্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ বাড়ায় সাধারণ সর্দি, কাশি, জ্বরসহ শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ নিয়ে মানুষ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ছুটছে। হাসপাতালগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ও জরুরি বিভাগের প্রায়শই বেড পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, ফলে রোগীদের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, শুধু রাজধানীতে না, দেশের বিভিন্ন বড় শহরে এই ধরনের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আগমনের সংখ্যা গত কয়েক সপ্তাহে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ মারাত্মক আকার নিতে পারে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন। চিকিৎসকরা জানান, সাধারণ ঠাণ্ডা-জ্বরের সঙ্গে হামের উপসর্গ মিলিয়ে রোগীকে প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা জরুরি। এছাড়া হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার, জনসমাগম এড়ানো এবং সময়মতো টিকা নেয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতের কর্তৃপক্ষও সতর্ক হয়ে হাসপাতালে অতিরিক্ত কর্মচারী নিয়োগ করেছেন এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে একাধিক শিশু ভর্তি হতে দেখা গেছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এদের অধিকাংশই কয়েক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিল এবং উপসর্গ স্পষ্ট হওয়ার পর দেরিতে হাসপাতালে আনা হয়েছে।
উপসর্গ দেখা দিলেও দেরিতে শনাক্ত : হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতা তাদের। প্রথমে শিশুদের জ্বর, সর্দি বা ডায়রিয়া হয়। এরপর ৪ থেকে ৫ দিনের মধ্যে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তখনই অনেকের মনে হয় এটি হাম হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এটি হামের একটি ক্লাসিক উপসর্গের ধাপ। তবে অনেক অভিভাবক শুরুতে এটিকে সাধারণ ঠাণ্ডা বা ভাইরাল জ্বর মনে করে গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।
সব উপসর্গ মানেই হাম নয় : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতালে যেসব রোগী আসছেন, তাদের সবাই যে হামে আক্রান্ত্ততা নয়। অনেক সময় অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায়। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যার লক্ষণগুলো হলো- উচ্চ জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও শরীরে লাল ফুসকুড়ি। তবে একই উপসর্গ অন্যান্য ভাইরাসজনিত অসুখেও থাকতে পারে। তাই পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যায় না।
ফার্মেসিনির্ভর চিকিৎসা বাড়াচ্ছে ঝুঁকি : চিকিৎসকদের উদ্বেগের একটি বড় কারণ হলো অনেক অভিভাবক শিশু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসিতে যান। সেখানে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ দেয়া হয়, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়, রোগের প্রকৃত কারণ আড়ালে থেকে যায়। ফলে রোগের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায় এবং পরে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
চিকিৎসকদের পরামর্শ- দেরি নয়, দ্রুত ব্যবস্থা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু অসুস্থ হলে এক-দুদিনের মধ্যেই চিকিৎসকের কাছে নেয়া জরুরি। তাদের মতে- জ্বর দুদিনের বেশি থাকলে সতর্ক হতে হবে, শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করতে হবে, শিশুর খাওয়াদাওয়া কমে গেলে বা দুর্বল হয়ে পড়লে দেরি করা যাবে না। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হামের জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে : রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়েরোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতাল ছাড়াও অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে জানা গেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চিকিৎসকরা অভিভাবকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন- ১. লক্ষণ দেখলেই সতর্ক হোন। জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া- এসব উপসর্গকে হালকাভাবে নেবেন না। ২. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন- নিজে নিজে বা ফার্মেসি থেকে ওষুধ না নিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে যান। ৩. শিশুকে আলাদা রাখুন- সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখুন। ৪. টিকাদান নিশ্চিত করুন- সময়সূচি অনুযায়ী টিকা নেয়া হয়েছে কিনা নিশ্চিত করুন।
স্বাস্থ্য খাতে করণীয় : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা নয়, সরকারি পর্যায়েও কিছু পদক্ষেপ জরুরি। যেমন- টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, গণসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, ফার্মেসি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা।
সর্বোপরি, রাজধানীতে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। যদিও সব রোগী হামে আক্রান্ত নয়, তবুও ঝুঁকি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ তবে সঠিক সময়ে টিকা, সচেতনতা এবং দ্রুত চিকিৎসা না নিলে এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।