কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত, সময়ের কাঁটা ঘুরলেও ফুরোচ্ছে না জ্বালানি তেলের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের সামনে এখন মাইলের পর মাইল যানবাহনের সারি। পাম্পে তেল নেই, আর থাকলেও তা পেতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অসহ্য গরম আর দীর্ঘ অপেক্ষায় সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়েছে সরাসরি রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায়। দিনভর তেলের খোঁজে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটে চলা চালক ও যাত্রীদের ভোগান্তি এখন চরমে, যা কার্যত অচল করে দিয়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। রাজধানীর বাইরেও একই দৃশ্য দৃশ্যমান।
পাম্পে পাম্পে দীর্ঘ সারি, ১৮ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা : গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর প্রগতি সরণি, বিজয় সরণি, তেজগাঁও এবং মিরপুর রোডের পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা গেছে গাড়ির অবর্ণনীয় জট। কোনো কোনো পাম্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লাইনের দৈর্ঘ্য ৪ থেকে ৫ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। ভুক্তভোগী চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে তেলের জন্য রেশনিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। একজন বাস চালক জানান, ‘আমি গতকাল রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রায় ১৬ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, এখনো পাম্পের মুখ দেখিনি। পাব কি না জানি না, কিন্তু না নিয়ে ফেরারও পথ নেই।’ অনেক ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালককেও ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে বসে থাকতে দেখা গেছে।
পর্যাপ্ত নয় সরবরাহ, পাম্প মালিকদের অসহায়ত্ব : পাম্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সরবরাহ সংকটের কারণে তারা অসহায়। তেজগাঁও এলাকার একটি পাম্পের ম্যানেজার বলেন, ‘ডিপো থেকে আমাদের চাহিদার মাত্র ২০-৩০ শতাংশ তেল দেয়া হচ্ছে। সরবরাহ আসার দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ বাইরে শত শত গাড়ি অপেক্ষায় আছে।’
সরবরাহ কম থাকায় পাম্পগুলোতে তেল দেয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। চালকদের অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পর সামান্য যে পরিমাণ তেল দেয়া হচ্ছে, তা দিয়ে বড় জোড় একদিনের কাজ চালানো সম্ভব। ফলে প্রতিদিনের বড় একটি অংশই নষ্ট হচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে।
তেলের লাইনে অবরুদ্ধ সড়ক, যানজটে নাকাল নগরবাসী : জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু পাম্পের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে মূল সড়কেও। গাড়ির লাইন সড়কের এক পাশ পুরোপুরি দখল করে নেয়ায় সাধারণ যানবাহন চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গণপরিবহনের সংখ্যা রাস্তায় কম থাকায় এবং যানজটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেককে মাইলের পর মাইল হেঁটে অফিসে যেতে দেখা গেছে।
সংকটের নেপথ্যে কী : গত কয়েকদিনের সংবাদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানিতে টান পড়েছে। যদিও সরকার বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং বর্তমানে মজুত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বাড়ছে।
জনদাবি- কার্যকরী পদক্ষেপের আহ্বান : ভোক্তা এবং চালকদের দাবি, শুধুমাত্র আশ্বাস নয়, বরংদৃশ্যমান ও কার্যকরী উদ্যোগের মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা, যা নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ইতোমধ্যে অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ দ্রুত এই লাইনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি চায়। রাজধানীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার সুশৃঙ্খল কোনো বণ্টন ব্যবস্থার দিকে হাঁটবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধও ১৫ দিনের বিরতি দিয়েছে। যার প্রভাবে তেলের দাম কিছুটা কমতে পারে পাশাপাশি সরবরাহও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংগ্রহের এই অন্তহীন সংগ্রাম কেবল রাজপথের যানজটই বাড়াচ্ছে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতিকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিচ্ছে। পাম্পের সামনে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ সারি এখন রাজধানীর চরম অব্যবস্থাপনার এক জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তেল বা গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্যও এক অশনিসংকেত। এই সংকট নিরসনে কেবল আশ্বাস নয়, বরং জ্বালানি আমদানিতে স্থবিরতা দূর করা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে জরুরি ও টেকসই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের এই ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ ও ভোগান্তি অদূর ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।