রাজধানীর ভোজ্যতেলের বাজারে আবারও শুরু হয়েছে অস্থিরতা, যার নেপথ্যে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপকৌশল। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই আর সরবরাহ ঘাটতির অজুহাতে মিলার ও ডিলাররা সিন্ডিকেট করে বাজার থেকে তেল সরিয়ে ফেলছে।
বর্তমানে রাজধানীর প্রধান পাইকারি ও খুচরা বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। সাধারণ মানুষ এক লিটার তেলের জন্য এক দোকান থেকে অন্য দোকানে হন্যে হয়ে ঘুরলেও মিলছে কেবল ‘নেই’ শব্দটা।
অভিযোগ উঠেছে, ভোজ্যতেলের দাম লিটারপ্রতি আরও ১০ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর লক্ষ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিকল্পিতভাবে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। একদিকে নির্ধারিত দামের চেয়ে খোলা তেল অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, অন্যদিকে বোতলজাত তেলের মজুত থাকলেও তা সাধারণের নাগালে দেওয়া হচ্ছে না। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও র্যাবের অভিযানে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ অবৈধ মজুত জব্দ হচ্ছে, তবুও থামছে না এই জিম্মি করার সংস্কৃতি।
সিন্ডিকেটের এই সুকৌশলী কারসাজিতে রাজধানীর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের রান্নাঘরে এখন হাহাকার বিরাজ করছে। প্রশাসনের কঠোর তদারকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার কারওয়ানবাজারে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ দোকানেই তেলের ড্রাম খালি পড়ে আছে।হাতেগোনা কয়েকটি দোকানে তেল মিললেও তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানিগুলো এখন চাহিদার মাত্র ৫ ভাগের ১ ভাগ তেল সরবরাহ করছে। অর্থাৎ, যেখানে দৈনিক ১০০ লিটার তেলের চাহিদা রয়েছে, সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২০ লিটার।
ব্যবসায়ী রিজভী আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ক্রেতারা দোকানে এসে সবার আগে তেল খোঁজেন। তেল নেই শুনলে তারা অন্য সওদাও করতে চান না। এতে আমাদের অন্যান্য পণ্যের বিক্রিও কমে গেছে। আমরা এখন ডিলারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি।”
ঈদুল ফিতরের পর থেকেই বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। অভিজ্ঞ মহল বলছে, প্রতিবারই দাম বাড়ানোর আগে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা একটি পরিচিত কৌশলে পরিণত হয়েছে। এরই মধ্যে বাজারে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
বর্তমানে বাজারের চিত্রটি অনেকটা এরকম :
জানা গেছে, ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও বিপণনকারী কোম্পানিগুলো সরকারের কাছে নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাব অনুমোদনের আগেই তারা সরবরাহ কমিয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে যাতে সরকার দাম বাড়াতে বাধ্য হয়।
মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত নতুন দামের তালিকা প্রস্তাব অনুমোদন না দিলেও মাঠ পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতারা অনেক আগেই বাড়তি দামে তেল বিক্রি শুরু করেছেন। বিক্রেতা রফিক জানান, ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে তাদেরও কম লাভে বা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
ক্যাবের প্রতিক্রিয়া ও সিন্ডিকেট দমন : কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মতে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই জিম্মি করার সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং এরপরই দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়।
ক্যাব সভাপতি শফিকুজ্জামান এই পরিস্থিতির জন্য সরকারের তদারকি সংস্থাকে দায়ী করে বলেন, ‘সরকার যেন ব্যবসায়ীদের কথায় না চলে বরং আইন অনুযায়ী চলে। কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বচ্ছ ব্যবসা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ শেষ হবে না।’
সাধারণ মানুষের ভোগান্তি : বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতাদের চোখেমুখে এখন কেবল অনিশ্চয়তার ছাপ। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য ২১০ টাকা লিটার দরে তেল কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্রেতা অভিযোগ করেছেন, বাড়তি দাম দিলেও ঠিকমতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন বাজারে দেখা যাচ্ছে না।
পরিশেষে বলা যায়, ভোজ্যতেলের এই কৃত্রিম সংকট কেবল সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং একশ্রেণির অসাধু মজুতদারের সুপরিকল্পিত কারসাজি। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের জিম্মি করার এই সংস্কৃতি দেশের অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। র্যাবের সাঁড়াশি অভিযান ও বিপুল পরিমাণ তেল জব্দ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির কোনো বিকল্প নেই। কেবল জরিমানা নয়, সিন্ডিকেটের মূল উৎপাটনে দীর্ঘমেয়াদী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সরকারের সময়োচিত হস্তক্ষেপ এবং কঠোর বাজার মনিটরিংই পারে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এবং অশুভ চক্রের এই অপতৎপরতা চিরতরে বন্ধ করতে।