দেশের কৃষি অর্থনীতির মেরুদণ্ড যখন বোরো মৌসুমের ভরা প্রস্তুতির ওপর দাঁড়িয়ে, ঠিক তখনই জ্বালানি সংকটের কালো ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে সারের বাজারে। বর্তমানে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহে টান পড়ায় দেশের বড় বড় সার কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন ও সরবরাহের এই ঘাটতিকে কেন্দ্র করে মাঠপর্যায়ে শুরু হয়েছে সারের তীব্র হাহাকার। জ্বালানি সংকটের অজুহাতে আমদানিনির্ভরতা বাড়লেও ডলার সংকটের কারণে সময়মতো সার খালাস করা যাচ্ছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
প্রান্তিক কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে সারের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি জানানো হলেও ডিলারদের কাছে গিয়ে মিলছে না প্রয়োজনীয় ইউরিয়া বা টিএসপি। এই সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট চক্র সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি কয়েকশ টাকা বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতির প্রভাবে পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সারের এই কৃত্রিম সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
সার হলো কৃষি উৎপাদনের প্রাণ; যদি সঠিক সময়ে কৃষক সুলভ মূল্যে সার না পায়, তবে ফসলের ফলন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে নেমে আসবে। এতে কেবল কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে সারের এই সংকট জিইয়ে রাখা হলে তা আগামীতে খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাই এই মুহূর্তে সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজার তদারকি জোরদার করা এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমদানিতে যুদ্ধের কালো মেঘ ও এলসি জটিলতা : বাংলাদেশ তার ইউরিয়া সারের চাহিদার একটি বড় অংশ ওমান, কাতার এবং ভারত থেকে আমদানি করে। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সেই দেশগুলো থেকে সরবরাহ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমদানিকারকরা জানাচ্ছেন, সাধারণত মৌসুম শুরুর ৩-৪ মাস আগেই আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শুরুর কথা থাকলেও এবার তা অনেকটাই পিছিয়ে গেছে।
ইন্ডিগো গ্লোবাল নেটওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী আবতাহিইসলাম শুভ জানান, বেসরকারি পর্যায়ে ২ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির দরপত্র আহ্বান করা হলেও সময়মতো পণ্য আনা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি সরকারের ডলার সংকট এবং এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) পেমেন্টে বিলম্বের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেন।
আরেকজন আমদানিকারক জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা দুবাইয়ের ব্যাংকগুলো এখন ১০০ শতাংশের বেশি ব্যাংক গ্যারান্টি দাবি করছে। ২ লাখ ডলারের সার আনতে হলে সমপরিমাণ বা তারও বেশি অর্থ আগেই জমা রাখতে হচ্ছে। এই বিশাল অংকের মূলধন বিনিয়োগের পর সরকারি জটিলতায় যদি পণ্য পৌঁছাতে দেরি হয়, তবে তার প্রভাব সরাসরি পড়বে কৃষকের ওপর।
গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে দেশি কারখানা : দেশের সার কারখানাগুলোর চিত্র আরও হতাশাজনক। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে বিসিআইসির অধিকাংশ কারখানা বন্ধ। বর্তমানে গড়ে মাত্র একটি কারখানা সচল থাকে। ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার চালু রাখতে গিয়ে শাহজালাল ফার্টিলাইজার বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সরকারকে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন যখন তলানিতে, তখন আমদানিতে এই বাধা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
বিসিআইসির পরিচালক মো. দেলোয়ার হোসেন অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকারি কারখানাগুলো যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সচল রাখতে পারে, তবে বড় সমস্যা হবে না। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সরবরাহ নিয়ে সরকারকে এখন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে- গ্যাস কি বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাবে নাকি সার কারখানায়?
সেচ সংকটে বিপন্ন বোরো চাষ : উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ডিজেল সংকটে সেচ পাম্পগুলো ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। ডিজেলের আকাশচুম্বী দাম: সরকারি দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। বিদ্যুৎ বিভ্রাট: লোডশেডিংয়ের কারণে যারা বৈদ্যুতিক পাম্প ব্যবহার করেন, তাদের বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে ডিজেলচালিত পাম্প চালাতে হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: সার ও ডিজেলের দাম বাড়ায় এক বিঘা জমিতে ধান চাষের খরচ কৃষকের লাভের অঙ্ককে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বর্তমানে সবার চোখ কেবল পেট্রল পাম্পের লাইনের দিকে। কিন্তু কৃষক পর্যাপ্ত ডিজেল বা সার পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। ইউরিয়ার চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত কারখানা আমাদের সচল নেই। সার ও সেচ সংকটের কারণে উৎপাদন কমলে দেশে মূল্যস্ফীতি ভয়াবহ রূপ নেবে।’
সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব : বিশ্লেষকদের মতে, সার ও ডিজেল সংকটের ফলে কেবল কৃষি উৎপাদনই কমবে না, বরং এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর। ১. খাদ্য ঘাটতি: চাল ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। ২. মূল্যস্ফীতি: উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজারে চালের দাম বাড়বে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হবে। ৩. জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়: যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক রুটে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানিকৃত সারের দাম আরও বাড়বে।
উত্তরণের পথ কী : আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, সরকারকে এখন কৌশলী ও সাহসী হতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনে বিদ্যুৎ খাতে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও কৃষিকে বাঁচাতে হবে। সেই সাথে বেসরকারি আমদানিকারকদের এলসি জটিলতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। কৃষক যদি মাঠে সার দিতে না পারে এবং সেচের অভাবে ধান শুকিয়ে যায়, তবে পেট্রল পাম্পের লাইনের চেয়েও বড় লাইন পড়বে ওএমএসের চালের ট্রাকের পেছনে এমনটাই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বোপরি, পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সারের এই হাহাকার দেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত। কৃষক যদি সময়মতো এবং সুলভ মূল্যে সার না পায়, তবে বোরো বা আমন মৌসুমে ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেই অস্থিরতা তৈরি হবে না, বরং চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানিনির্ভরতা বাড়ব্তেযা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
তাই এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আমদানিকৃত সার দ্রুত খালাস ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সুষম বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। মনে রাখতে হবে, জ্বালানি সংকটের সমাধান যেমন জরুরি, তেমনি সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ; কারণ দেশের ১৭ কোটি মানুষের অন্ন সংস্থান এই কৃষি খাতের ওপরই নির্ভরশীল। কৃষকের এই হাহাকার থামাতে না পারলে আগামীতে দেশ বড় ধরনের খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে।