বড় ঋণের পথে বাংলাদেশ

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম

২০২৬ সালের চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৩০০ কোটি ডলারের (৩ বিলিয়ন) নতুন ঋণের সন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চাপ সামলাতে এই বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক সহায়তা এখন সময়ের দাবি।

বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ কিংবা উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এই ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি যেমন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার করতে পারে, তেমনি এটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন কোনো ঝুঁকি তৈরি করবে কি না- তা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিশ্লেষণ। মূলত আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের ব্যয় মেটানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রক্ষায় এই ঋণের ওপরই এখন বড় ভরসা রাখছে নীতিনির্ধারকরা।

আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ : অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুন পর্যন্ত মাত্র চার মাসে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ৩০০ কোটি ডলার প্রয়োজন। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজির দাম ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৫ সালের মার্চ-জুন সময়ে যেখানে এসব পণ্য আমদানিতে ৩০১ কোটি ডলার খরচ হয়েছিল, চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এই বিশাল বাড়তি খরচ মেটাতেই মূলত বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সরকারকে।

ভর্তুকির পাহাড়, ৩৮৫৪২ কোটি টাকার ঘাটতি : যুদ্ধের কারণে শুধু আমদানিতেই নয়, অভ্যন্তরীণ বাজেটেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থানপত্র অনুযায়ী আগামী চার মাসে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সার খাতে বাড়তি ভর্তুকি লাগবে ৩৮,৫৪২ কোটি টাকা, বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৫৯,০০০ কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়াবে ৯৭,৫৪২ কোটি টাকায়।

সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যাওয়া ঠেকাতে এই ভর্তুকি বজায় রাখতে চায়। গত ৯ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হলেও এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি।

রিজার্ভ ও মুদ্রাস্ফীতির শঙ্কা : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের নেয়া পদক্ষেপে রিজার্ভ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হলেও যুদ্ধের ধাক্কায় মার্চ শেষে তা কমে ২৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল। বর্তমান সংকটে আবারও দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে, যা নিত্যপণ্যের দামকে আরও উসকে দিতে পারে।

ওয়াশিংটনে দাতা সংস্থাদের সঙ্গে আলোচনা : বর্তমানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ওয়াশিংটনে বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অংশ নিচ্ছেন। সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফের কাছে অতিরিক্ত ঋণের প্রস্তাব দেয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি ও এআইআইবির সঙ্গেও বাজেট সহায়তার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাজেট সহায়তা চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে দাতা সংস্থাগুলো জানতে চাইবে সরকার রাজস্ব বাড়াতে কী ধরনের নীতিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং ভর্তুকি কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দামের সমন্বয় কেন করছে না।’

বর্তমান প্রেক্ষাপট : গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিন পর মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হয়। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও হরমুজ প্রণালি এখনো না খোলায় এবং জ্বালানি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ফলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য আগামী কয়েক মাস বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের হতে যাচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, ৩০০ কোটি ডলারের এই বিশাল ঋণের অনুসন্ধান বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য যেমন একটি বড় সুযোগ, তেমনি এটি একটি কঠিন পরীক্ষাও বটে। বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর বাজার যে চাপের মুখে পড়েছে, তা সামলাতে এই বৈদেশিক মুদ্রার যোগান অত্যন্ত জরুরি।

তবে এই ঋণের সফল প্রাপ্তিই শেষ কথা নয়; বরং সংগৃহীত অর্থের যথাযথ ব্যবহার, পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। সরকার যদি স্বচ্ছতা ও সঠিক নীতিমালার মাধ্যমে এই ঋণের সদ্ব্যবহার করতে পারে, তবেই ২০৩৪ সালের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়া সম্ভব হবে। অন্যথায়, ঋণের বোঝা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে নীতিনির্ধারকদের তীক্ষ নজর রাখা বাঞ্ছনীয়।