বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অস্থিরতা আর ভূ-রাজনৈতিক উত্তাপের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের অন্দরমহলে। বর্তমানে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোতে বিরাজ করছে এক অদ্ভূত ও বৈপরীত্যপূর্ণ চিত্র। একদিকে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় সবজি ও মুরগির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এক পশলা বৃষ্টির মতো আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।
অন্যদিকে, বাঙালির চিরচেনা ‘মাছে-ভাতে’ ঐতিহ্যে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছের বাজারের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। জ্বালানি তেলের অনিশ্চয়তার কারণে পরিবহন খরচ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমিষের বড় এই উৎসের ওপর। এক সপ্তাহের ব্যবধানে সবজিতে কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা কমলেও, মাছের কাঁটা যেন বিঁধছে সাধারণ মানুষের পকেটে।
বিশেষ করে ইলিশ ও চাষের মাছের অস্বাভাবিক দাম সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকাকে সংকুচিত করে তুলছে। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উৎসব-পরবর্তী এই সময়ে সবজির দাম কমাটা ইতিবাচক হলেও, মাছের বাজারের অস্থিরতা নিরসনে দ্রুত সরকারি তদারকি প্রয়োজন। স্বস্তি ও অস্বস্তির এই দোটানায় পড়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ এখন প্রতিবেলা খাবারের হিসাব মেলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। রান্নাঘরের এই মিশ্র হাওয়া শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বাজারগুলোতে সবজি ও মুরগির দামে কিছুটা পতন লক্ষ করা গেছে, যা মধ্যবিত্তের পকেটে স্বস্তি দিচ্ছে। তবে সেই স্বস্তি উধাও হয়ে যাচ্ছে মাছের বাজারে গিয়ে; সেখানে প্রায় সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। শেওড়াপাড়া ও তালতলা কাঁচাবাজার ঘুরেও একই দৃশ্য দেখা গেছে।
সবজির বাজার: নিম্নমুখী গ্রাফে স্বস্তি
গত সপ্তাহের তুলনায় গ্রীষ্মকালীন সবজির সরবরাহ বাড়ায় বাজারে দামের পারদ এখন নিম্নমুখী। প্রায় সব ধরনের সবজিতে কেজিতে ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
মুরগি ও মাংস: কমতির দিকে সোনালি ও ব্রয়লার
মাংসের বাজারে মুরগির দাম কমাটা সাধারণ মানুষের জন্য বড় সুখবর। বিশেষ করে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমেছে।
মুরগির ধরণ বর্তমান দাম (কেজি)
গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংসের দাম ১,২০০ টাকায় অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে গরুর মাথার মাংস ৪৫০ টাকা ও বট ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাছের বাজার : উত্তাপ ছড়াচ্ছে মাছের কাঁটা
সবজি আর মুরগিতে যেটুকু সাশ্রয় হচ্ছে, তার পুরোটাই যেন শুষে নিচ্ছে মাছের বাজার। নদী ও বিলের মাছ তো বটেই, চাষের মাছের দামও আজ আকাশছোঁয়া।
ডিম ও অন্যান্য নিত্যপণ্য : ডিমের বাজারে স্থিতি বজায় রয়েছে। এক ডজন লাল ডিম ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে হাঁসের ডিমের দাম কিছুটা বেশি, প্রতি ডজন ২০০ টাকা। আলু ২৫ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত।
পরিশেষে বলা যায়, রাজধানীর কাঁচাবাজারে সবজি ও মুরগির দামের নিম্নমুখী প্রবণতা সাধারণ মানুষের জন্য সাময়িক স্বস্তি বয়ে আনলেও, মাছের বাজারের অস্থিরতা সেই আনন্দকে ম্লান করে দিয়েছে।
নিত্যপণ্যের এই অসম দরবৃদ্ধি মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অনিশ্চয়তাকেই বারবার সামনে নিয়ে আসছে। সবজিতে পকেট বাঁচলেও মাছের বাজারে গিয়ে সেই সাশ্রয়টুকুও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের পারিবারিক বাজেটকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
বাজারের এই ‘স্বস্তি-অস্বস্তির’ দোলাচল বন্ধ করতে কেবল মৌসুমি সরবরাহের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং জ্বালানি তেলের সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াতে না পারে, সে জন্য কঠোর বাজার মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যস্থতাকারীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থিতিশীল ও সুষম বাজার ব্যবস্থাপনাই পারে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে প্রকৃত স্বস্তি ফিরিয়ে দিতে এবং সবার জন্য সুষম খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে। অন্যথায়, নিত্যপণ্যের এই মিশ্র হাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।