জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর নতুন এক বোঝা হয়ে চেপে বসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এই মূল্য সমন্বয় করা হলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে এবং কলকারখানার চিমনিতে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি- সব মিলিয়ে দেশের বাজার ব্যবস্থায় এক ধরনের ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যথাযথ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই অর্থনৈতিক চাপ সামলানো সম্ভব হবে না।
ভর্তুকি বনাম বাস্তবতার লড়াই : সরকার বলছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমাতে এই সিদ্ধান্ত অপরিহার্য ছিল। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর ভর্তুকির চাপ কমাতে এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর (যেমন আইএমএফ) শর্ত পূরণ করতে গিয়ে মূল্য সমন্বয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে টাইমিং বা সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, ‘জ্বালানির দাম সমন্বয় অনেক আগেই প্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু বর্তমানে দেশের অর্থনীতি যখন বিনিয়োগ স্থবিরতা ও নিম্ন প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতিকে আবার দ্বিগুণ অঙ্কের ঘরে পৌঁছে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।’
অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে চড়া মাশুল : জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি চক্রাকার সংকট তৈরি করছে। ১. পরিবহন ও পণ্যমূল্য: জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাস ও ট্রাক ভাড়া বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদনস্থল থেকে বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাল, ডাল, সবজিসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ২. শিল্প ও উৎপাদন খাত: ডিজেল ও তেলের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত এখন অস্তিত্ব সংকটে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, যা সরাসরি কর্মসংস্থান হ্রাসের হুমকি তৈরি করছে। ৩. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দক্ষতা: তেলের দাম বাড়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ বাড়বে, যার চূড়ান্ত বোঝা আবার বিদ্যুতের বাড়তি দাম হিসেবে গ্রাহকের ওপর চাপানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ- ‘ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দায়’ : বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘চরম অস্থিরতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, তেলের দাম লিটারে ১৫-২০ টাকা বাড়লে পণ্যের ওপর সামান্য প্রভাব পড়ার কথা থাকলেও, বাজারে তদারকির অভাবে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী কয়েকগুণ বেশি দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
তিনি আরও যোগ করেন, ‘পেট্রোল পাম্পগুলোতে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম বাড়লে যেমন খুশি হই, কমার সময়ও সেই অনুপাতে কমানো উচিত। বর্তমানে প্রতিদিন গ্রাহকদের সঙ্গে ঝগড়া করে ব্যবসা চালানো সম্ভব হচ্ছে না।’
সমাধানের পথে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিকল্প জ্বালানি : অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এই সংকট থেকে উত্তরণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা দিয়েছেন— সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বিশেষ খাদ্য সহায়তা ও নগদ প্রণোদনা চালু করা। বিশেষ করে শহর ও গ্রামে ৩-৪ মাসের বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি: জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও বায়ু শক্তি) ব্যবহার বৃদ্ধি করা। গণপরিবহন আধুনিকায়ন: ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে মানসম্মত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাতে জ্বালানি সাশ্রয় হয়। বাজার তদারকি: খুচরা বাজারে পণ্যমূল্যের অযৌক্তিক বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকারের কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা।
সর্বোপরি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ইতিবাচক দিক হিসেবে সরকারের আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা পাওয়ার কথা থাকলেও, নেতিবাচক প্রভাবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে কেবল ‘মূল্য সমন্বয়’ নয়, বরং জনস্বার্থ রক্ষা করে একটি কার্যকর ‘ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট’ গড়ে তুলতে হবে। নতুবা এই তেলের আগুন অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রকে ভস্মীভূত করতে পারে।