সৌরশক্তিতে ঝুঁকছে শিল্পকারখানা

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ২৩, ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম

সামপ্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই জ্বালানির উৎস হিসেবে সৌরশক্তি বাংলাদেশের শিল্প খাতে এক নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে। এক সময় কেবল আবাসিক বা ক্ষুদ্র পরিসরে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলো তাদের কারখানার ছাদে বিশাল পরিসরে সোলার প্যানেল স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল এবং সিমেন্ট খাতের মতো বিদ্যুৎ-নিবিড় শিল্পগুলোতে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয়। শিল্পমালিকদের এই আগ্রহের পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ কাজ করছে।

প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ কমানোর তাগিদ। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে কারখানাগুলো তাদের গ্রিড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাসিক বিলের ওপর বিশাল সাশ্রয় করতে সক্ষম হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন এনার্জি’ ব্যবহারের শর্ত এবং ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান চাপ। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত পণ্যগুলোকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন সময়ের দাবি। সরকারের সহজ শর্তে ঋণ এবং উদ্ভাবনী ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থার ফলে শিল্পকারখানায় সৌরশক্তির প্রসার আরও গতিশীল হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা আর অর্থনৈতিক সাশ্রয়- এই দুইয়ের মেলবন্ধনে সৌরশক্তি এখন বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই রূপান্তর কেবল কারখানার মালিকদের জন্যই লাভজনক নয়, বরং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমিয়ে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে।

সংকটের বর্তমান চিত্র- অন্ধকারে পোশাক খাত : বর্তমানে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। জ্বালানি তেল বা ডিজেলের সংকট থাকায় জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজিএমইএর তথ্যমতে, সময়মতো পণ্য  উৎপাদন করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতাদের কাছে শিপমেন্ট বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয়ের এই খাতকে বাঁচাতে টেকসই সমাধান এখন সময়ের দাবি।

বিজিএমইএর যুগান্তকারী উদ্যোগ- সোলার প্যানেল ও প্রণোদনা : এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিএমইএ সদস্য কারখানাগুলোকে নিজস্ব উদ্যোগে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে বিশেষ নোটিশ জারি করেছে। এই উদ্যোগকে জনপ্রিয় করতে ঘোষিত সুবিধাগুলো হলো- স্বল্প সুদে ঋণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তাদের মাত্র ৫ থেকে ৫.৫ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

সার্ভিস ফি মওকুফ: আগামী ৩ মাসের মধ্যে যেসব কারখানা সোলার প্রকল্প হাতে নেবে, তাদের বিজিএমইএর সার্ভিস ফি-তে ৫০ শতাংশ ছাড় দেয়া হবে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়: এই প্রকল্প সফল হলে কারখানাগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত নিজস্ব উৎস থেকে মেটানো সম্ভব হবে।

কৌশলগত কারণ- পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স ও ইউরোপীয় বাজার : সোলার প্যানেল স্থাপন কেবল বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান নয়, এটি এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য শর্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো বর্তমানে ‘গ্রিন এনার্জি’ বা নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে।

বিজিএমইএর পরিচালক মো. এম মহিউদ্দিন চৌধুরী জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে কারখানাকে পরিবেশবান্ধব করা ছাড়া বিকল্প নেই। সোলার প্যানেল স্থাপন করলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বাড়বে এবং রপ্তানি আদেশ বৃদ্ধি পাবে।

চ্যালেঞ্জ- আমদানি নীতি ও শুল্ক বাধা : বিজিএমইএর এই মহতী উদ্যোগের পথে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে বর্তমান আমদানি নীতি। গার্মেন্ট মালিকদের দাবি, সোলার প্যানেল ও এর যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।

বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট এসআরও জারি করা প্রয়োজন। আমদানি নীতিতে সহজীকরণ ও শুল্ক ছাড় না দিলে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েও এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করা কঠিন হবে।’

বিশেষজ্ঞের অভিমত- টেকসই সমাধানের পথ : চট্টগ্রাম ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম এই উদ্যোগকে ‘যুগোপযোগী’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে এবং কারখানার উৎপাদন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে কমিয়ে আনতে সৌরবিদ্যুৎই একমাত্র স্থায়ী সমাধান। এতে একদিকে যেমন কার্বন নিঃসরণ কমবে, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও সাশ্রয় হবে।

গার্মেন্টস শিল্পের বর্তমান বিস্তার ও সম্ভাবনা : বর্তমানে দেশে ৪ হাজারের বেশি নিয়মিত গার্মেন্টস কারখানা এবং আটটি ইপিজেডে আরও প্রায় ৬০০ কারখানা চালু রয়েছে। এই বিশাল শিল্পাঞ্চল যদি সৌরশক্তির আওতায় আসে, তবে তা দেশের জ্বালানি মানচিত্রে বিপ্লব ঘটাতে পারে। উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত আমদানি বাধা অপসারণ করে এই ‘সোলার মিশন’ সফল করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

সর্বোপরি, জ্বালানি সংকট গার্মেন্টশিল্পের জন্য যে অশনিসংকেত নিয়ে এসেছে, তার মোকাবিলায় বিজিএমইএর এই উদ্যোগ অত্যন্ত সাহসী। তবে এর পূর্ণাঙ্গ সফলতা নির্ভর করছে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর। ৫ শতাংশ সুদে ঋণ আর ফি মওকুফের পাশাপাশি আমদানি নীতিতে নমনীয়তা এলে বাংলাদেশের গার্মেন্টশিল্প আবারও তার হারানো ছন্দ ফিরে পাবে এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।