বৃষ্টির স্বস্তিতে প্রকৃতির মরণকামড়

রুহেল হাশেমী প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা অসহনীয় তাপপ্রবাহের পর গতকাল রোববার বিকেলের দিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আকাশ কালো করে কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বৃষ্টি জনজীবনে স্বস্তি আনার কথা থাকলেও বজ্রপাতের তাণ্ডবে মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। মাঠের কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে কিংবা আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় বজ্রাঘাতে না ফেরার দেশে চলে গেছেন ১৪ জন মানুষ।

গাইবান্ধায় লাশের মিছিল, একই গ্রামে তিন প্রাণহানি : বজ্রপাতের সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত এসেছে গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে। বিকেলের কালবৈশাখীতে জেলাটিতে শিশুসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাড়ির পাশের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সরাসরি বজ্রপাতে প্রাণ হারান ১০ বছর বয়সি ফুয়াদ চৌধুরী, ১৫ বছর বয়সি রাফি চৌধুরী এবং ২০ বছরের তরুণ মিজান মিয়া। তিন তরতাজা প্রাণের অকাল বিদায়ে পুরো গ্রাম এখন বাকরুদ্ধ।

একই সময়ে ফুলছড়ি উপজেলার দেলুয়াবাড়ি চরে ঘোড়ার গাড়িতে করে গরুর ঘাস নিয়ে ফেরার পথে মানিক মিয়া (২৫) নামের এক যুবক নিহত হন। সাঘাটা উপজেলায় নিজের ছাগল দেখতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন ৬৫ বছর বয়সি বৃদ্ধ নম্বার আলী। বজ্রপাতের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, সুন্দরগঞ্জে একটি গরুও মারা গেছে এবং শামীম মিয়া নামের একজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে শোকের ছায়া- বিয়ের ৮ দিন পরই চিরবিদায় : উত্তরের আরেক জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পৃথক ঘটনায় নারীসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। পীরগঞ্জ উপজেলার লাবণী আক্তার (৩৫) ঘাস কেটে বাড়ি ফেরার পথে এবং ইলিয়াস আলী (৩৭) ফসলের মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতের শিকার হন।

সবচেয়ে হূদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায়। ধামোর ইউনিয়নের সোনাপাতিলা এলাকায় চা-পাতা তুলে ফেরার পথে বজ্রাঘাতে নিহত হন ২২ বছর বয়সি শ্রমিক সোহরাওয়ার্দী। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাত্র আট দিন আগে বিয়ে করেছিলেন এই তরুণ। তার এই মৃত্যুতে নববধূ ও পরিবারের সদস্যদের আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে।

সিরাজগঞ্জ ও জামালপুরে মৃত্যুর মিছিল : সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলায় মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে।ধানগড়া ইউনিয়নে মাঠের ধান স্তূপ করার সময় হোসেন আলী শেখ (২৫) এবং তাড়াশের বেত্রাশীন গ্রামে মাঠে কাজ করার সময় আবদুল হামিদ (৫০) মারা যান। হোসেন আলী তার স্ত্রী ও এক বছরের শিশু সন্তানকে রেখে গেছেন, যা পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

জামালপুর সদর ও মেলান্দহ উপজেলায় বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন আরও দুজন। মেলান্দহের মর্জিনা বেগম (২২) নিজের রান্নাঘরে কাজ করার সময় এবং সদরের হাসমত আলী (৪৫) ফসলের মাঠে কাজ করার সময় বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান। জামালপুরে এই ঘটনায় আরও চারজন আহত হয়েছেন এবং পাঁচটি গবাদিপশু মারা গেছে।

আবহাওয়া ও প্রশাসনের ভাষ্য : আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গ্রীষ্মের এই সময়ে মেঘের উচ্চতা ও ঘনত্বের কারণে বজ্রপাতের প্রকোপ বেশি থাকে। চলতি মাসের বাকি দিনগুলোতেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে এমন ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্যোগে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নিরাপত্তা সতর্কতা ও জনসচেতনতা : বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, আকাশ মেঘলা হওয়া বা মেঘের ডাক শোনার সাথে সাথে খোলা মাঠ বা গাছতলার নিচে অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষি কাজের সময় আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তন হলে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া জরুরি। কিন্তু সচেতনতার অভাবে প্রতি বছরই বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বৃষ্টির পরশ হয়তো উত্তপ্ত ধরণীকে শীতল করবে, কিন্তু গাইবান্ধা, পঞ্চগড় বা সিরাজগঞ্জের ওই পরিবারগুলোর শূন্যতা কখনোই পূরণ হবে না। যারা জীবন ও জীবিকার তাগিদে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠে থাকেন, তাদের নিরাপত্তা ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জোরালো উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। ১২টি পরিবারের এই বিলাপ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির আশীর্বাদও মাঝেমধ্যে কতটুকু নিষ্ঠুর হতে পারে।

জেএইচআর