হুমকির মুখে দেশের জনস্বাস্থ্য

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬, ০২:২১ পিএম
  • ৬ রোগের টিকা সংকটে দেশ
  • ঝুঁকিতে ৩০ লাখ শিশু

২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য এক বহুমুখী ও জটিল সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে নোনা পানির আগ্রাসন সুপেয় পানির উৎসগুলোকে ধ্বংস করছে, অন্যদিকে প্রতিরোধযোগ্য রোগ হিসেবে পরিচিত ‘হাম’ মহামারি আকারে ফিরে এসে কেড়ে নিচ্ছে শত শত শিশুর প্রাণ। দেশের ৬১টি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ কেবল একটি স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার গভীরে লুকিয়ে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

একই সাথে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি জনস্বাস্থ্যের ওপর এক পরোক্ষ কিন্তু মারাত্মক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। পুষ্টিকর খাবারের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে অপুষ্টির হার বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

উপকূলের লবণাক্ততার কারণে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলে ভেজাল খাদ্য ও পরিবেশ দূষণ- সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। যে স্বাস্থ্য খাত একসময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল, প্রশাসনিক অবহেলা আর সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে আজ তা খাদের কিনারায়। এই সংকট থেকে উত্তরণে কেবল চিকিৎসা নয়, বরং জরুরি হয়ে পড়েছে এক আমূল সংস্কার ও সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।

শূন্য হচ্ছে কোল্ড চেইন, কোন জেলায় কী অবস্থা : অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত দেড় বছরে দেশের টিকাদান কর্মসূচি এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে রাজশাহী বিভাগে।

রাজশাহী বিভাগ: এই বিভাগের আটটি জেলার অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিকার মজুত এখন প্রায় শূন্য। বিশেষ করে পোলিও এবং পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার হাহাকার সবচেয়ে বেশি।

চট্টগ্রাম ও অন্যান্য বিভাগ: চট্টগ্রাম বিভাগে হামের টিকা পর্যাপ্ত থাকলেও জীবনরক্ষাকারী পেন্টাভ্যালেন্ট (ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস-বি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা) এবং যক্ষ্মার টিকার মজুত বড়জোর এক থেকে দেড় মাসের। রংপুর, খুলনা ও বরিশালের অনেক জেলায় এই সংকট আরও প্রকট। পরিসংখ্যান বলছে, নিয়মিত টিকা না পাওয়ায় বর্তমানে দেশে অন্তত ৩০ লাখ শিশু পোলিও, হাম-রুবেলা ও যক্ষ্মার মতো ১১টি মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে।

হামের প্রকোপ ও মৃত্যুর মিছিল : মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে তিল ধারণের জায়গা নেই। গত কয়েক দিনে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

আক্রান্তের চিত্র: প্রতিদিন শত শত শিশু জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অনেক অভিভাবক শুরুতে এটিকে সাধারণ এলার্জি বা জ্বর ভেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, যা পরবর্তীতে শিশুর জীবনকে সংকটাপন্ন করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞের সতর্কতা: ডিএনসিসি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার জানিয়েছেন, ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকেই আক্রান্ত শিশু অন্য শিশুদের সংক্রমিত করতে পারে। ফলে দ্রুত শনাক্তকরণ ছাড়া এই সংক্রমণ ঠেকানো অসম্ভব।

সরকারি বয়ান বনাম মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা : টিকা সংকট নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দেখা গেছে চরম বৈপরীত্য। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমপ্রতি এক সভায় দাবি করেছেন, দেশে কোনো টিকার সংকট নেই। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, অতীতে নিয়মিত টিকা না দেয়ায় শিশুদের বড় অংশ এখন হামে আক্রান্ত হচ্ছে। গত