বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হলো মহান মে দিবস। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেট চত্বরে শ্রমিকদের সেই আত্মত্যাগের ১৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা আজও যেন সেই অন্ধকার যুগেই থমকে আছে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কোটি কোটি শ্রমিকের কাছে মে দিবস মানে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ছুটির দিন, যার অন্তরালে লুকিয়ে আছে বঞ্চনা, শোষণ আর জীবনের অনিশ্চয়তা।
শ্রমিক নেতাদের মতে, তাজরীন ফ্যাশনস, রানা প্লাজা, সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপো কিংবা রূপগঞ্জের হাসেম ফুডসের অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং এগুলো মালিকপক্ষের অবহেলা ও সস্তা শ্রমের মানসিকতার ফসল যাকে তারা অভিহিত করছেন ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে।
বঞ্চনার চালচিত্র- পোশাক খাত থেকে গৃহশ্রম : বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কারখানার ভৌত কাঠামোতে আন্তর্জাতিক চাপে কিছু উন্নতি হলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ন্যূনতম মজুরি বনাম বাজারদর: ২০২৩ সালের শেষে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২,৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বর্তমান আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারে তা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের হাহাকার: দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে যুক্ত, যাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই, নেই আইনি সুরক্ষা। নির্মাণ শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অট্টালিকা বানালেও তাদের জন্য নেই কোনো বিমা বা চিকিৎসা সুবিধা। গৃহশ্রমিক ও কৃষি: গৃহশ্রমিকদের শ্রমের আজও কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই। ঘরের চার দেয়ালের ভেতর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
‘ভদ্রবেশী’ পেশায় নতুন শোষণ- ৮ ঘণ্টার প্রহসন : শ্রমিক নেতা রাজেকুজ্জামান রতনের মতে, শোষণ কেবল কায়িক শ্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংক, বিমা, আইটি খাত এবং সংবাদপত্র শিল্পের মতো ক্ষেত্রগুলোতেও ৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ছাঁটাই আতঙ্ক আর অতিরিক্ত কাজের চাপে কর্মীদের জীবনও এখন অমানবিক ও অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে।
আউটসোর্সিং ও গিগ ইকোনমি, শ্রমিকের পরিচয় হরণ : বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘আউটসোর্সিং’ বা ‘গিগ ইকোনমি’। উৎপাদন ও সেবা খাতের মালিকপক্ষ এখন সরাসরি নিয়োগ না দিয়ে থার্ড-পার্টির মাধ্যমে কর্মী নিচ্ছে। এর ফলে শ্রমিকরা তাদের মৌলিক আইনি অধিকার যেমন- সবেতন ছুটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড বা গ্র্যাচুইটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটি কার্যত মে দিবসের মূল চেতনা এবং শ্রমিকের আত্মপরিচয়ের ওপর চরম আঘাত।
পরিসংখ্যানের শুভঙ্করের ফাঁকি : সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেশে জিডিপি ও মাথাপিছু আয় বাড়ছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের জীবনের বিনিময় মূল্য ধরা হয় মাত্র ২ লাখ টাকা। যেখানে মাথাপিছু আয় সাড়ে ৩ লাখ টাকা, সেখানে শ্রমিকের জীবনের এই সস্তা দাম মানবতার প্রতি উপহাস ছাড়া আর কিছু নয়।’ তিনি আরও জানান, দেশে বিদ্যমান ৫৭টি মজুরি বোর্ডের মধ্যে ৪০টিই গত ৫ বছর ধরে কোনো মজুরি পুনর্নির্ধারণ করেনি।
নারী শ্রমিকের কান্না ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি : গার্মেন্ট শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশারেফা মিশু নারী শ্রমিকদের প্রতি শারীরিক ও যৌন হয়রানির বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, কারখানায় সুপারভাইজারদের অশালীন আচরণ এবং প্রোডাকশন টার্গেটের নামে মধ্যযুগীয় শোষণ আজও বন্ধ হয়নি। রানা প্লাজা বা তাজরীনের মতো ঘটনায় দোষী মালিকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি মালিকদের আরও বেপোয়ারা করে তুলেছে।
উত্তরণের পথ কী : শ্রম অধিকার কর্মীদের মতে, উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে যখন তাতে শ্রমিকের ন্যায্য অংশীদারিত্ব থাকবে। মে দিবসের চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি-
১. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি: বর্তমান বাজারদরের সাথে সংগতি রেখে সব খাতের জন্য একটি অভিন্ন ও সম্মানজনক জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা।
২. ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার: বর্তমানে মাত্র ৫ শতাংশ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাথে যুক্ত। এই হার বাড়িয়ে শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
৩. আবাসন ও স্বাস্থ্য: শ্রমঘন এলাকায় শ্রমিকদের জন্য সরকারি উদ্যোগে কলোনি বা ডরমিটরি এবং সুলভ মূল্যে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।
সর্বোপরি, মে দিবস মানে কেবল র্যালি বা রঙিন ফেস্টুন নয়; মে দিবস মানে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের নিশ্চয়তা। যতদিন পর্যন্ত কর্মস্থল নিরাপদ না হবে এবং শ্রমিকের মজুরি তার জীবন ধারণের জন্য পর্যাপ্ত না হবে, ততদিন মে দিবসের প্রকৃত সাফল্য বাংলাদেশে অধরাই থেকে যাবে।