মামলার পাহাড়ে চাপা বিচার বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬, ১২:১১ এএম

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের নাম ‘মামলাজট’। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টিতে। এই বিশাল জট সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে কেবল দীর্ঘসূত্রতাই করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক অধিকারকেও বাধাগ্রস্ত করছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণ এবং বিচার ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে আইন ও বিচার বিভাগ বর্তমানে একগুচ্ছ সমন্বিত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং প্রধান বিচারপতির সমন্বিত উদ্যোগে বিচার বিভাগে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া।

আপিল বিভাগে গতির সঞ্চার ও প্রধান বিচারপতির উদ্যোগ : বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ‘মামলা নিষ্পত্তি’কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর ফলাফলও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানান, দায়িত্ব নেয়ার মাত্র আড়াই মাসের মধ্যেই আপিল বিভাগে প্রায় চার হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এটি দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে পুরাতন মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করা এবং বিচারকদের এজলাসের সময় সর্বোচ্চ ব্যবহারের নির্দেশ দেয়ায় এই গতি ফিরেছে।

আইন সংস্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ‘স্মার্ট’ সমন : মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সংস্কার করেছে- সিভিল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল-২০২৬: এই বিলে প্রথাগত সমন জারির পরিবর্তে এসএমএস ও ভয়েস কলের মাধ্যমে সমন জারির বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এফিডেভিটের মাধ্যমে আরজি ও লিখিত জবাব দাখিলের প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে।

ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সংশোধন) বিল-২০২৬: ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে পলাতক আসামির অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতা পরিহার এবং ডিজিটাল সমন জারি নিশ্চিত করা হয়েছে। অনলাইন সাক্ষ্যগ্রহণ: তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর আওতায় চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য অনলাইনে গ্রহণ করা হচ্ছে, যা বিচার প্রক্রিয়ার সময় ও ব্যয়- উভয়ই সাশ্রয় করছে।

বিচারক ও আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি : অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটাতে সরকার বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে- ইতোমধ্যেই ৮৭১টি নতুন আদালত স্থাপন এবং ২৩২টি বিচারকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছে, বর্তমানে আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চলমান এবং ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে, বিচারকদের সহায়তার জন্য স্টেনোগ্রাফার ও কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যাতে রায় লেখার কাজে গতি আসে।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও মধ্যস্থতা : মামলা আদালতে আসার আগেই তা নিষ্পত্তির জন্য ‘মধ্যস্থতা’ বা এডিআর ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২০টি জেলায় এই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়ে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। এর ফলে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে নতুন মামলা দায়েরের হার কমেছে এবং সামাজিক সমপ্রীতি বজায় থাকছে।

বিনামূল্যে আইনি সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়ন : সাধারণ ও দুস্থ মানুষের জন্য বিচার প্রাপ্তি সহজ করতে আইনি সহায়তা কার্যক্রম উপজেলা পর্যায়ে সমপ্রসারণ করা হচ্ছে। হটলাইন ১৬৬৯৯: এই নম্বরের মাধ্যমে যে কেউ বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা নিতে পারছেন। ভবন নির্মাণ: দেশের ২৩টি জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। এছাড়া বিদ্যমান আদালত ভবনগুলোর ঊর্ধ্বমুখী সমপ্রসারণের কাজও চলছে।

বিচার বিলম্বে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা : রেজিস্ট্রার জেনারেলের মতে, বিচারক স্বল্পতা এবং এজলাস সংকটই বিলম্বের প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে একাধিক বিচারককে একই এজলাস ভাগ করে কাজ করতে হয়, যা কর্মঘণ্টা নষ্ট করে। তবে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. মাহফুজুর রহমান মিলন আশাবাদী যে, সরকারের গৃহীত এই বহুমুখী পদক্ষেপগুলো যদি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা হবে বিশ্বমানের স্বচ্ছ এবং জনগণবান্ধব।

সর্বোপরি, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের মনে যে হতাশা তৈরি করেছিল, সরকারের এই ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ তা দূর করতে শুরু করেছে। এসএমএসে সমন জারি থেকে শুরু করে অনলাইনে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রতিটি পদক্ষেপই একটি ‘স্মার্ট বিচার বিভাগ’ গড়ার প্রত্যয় বহন করে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, রাজপথের ভোগান্তি যেমন কমছে, তেমনি আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর ঘোরার দিনও এবার শেষ হবে।