ইজারার আগেই দখল পশুর হাট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ১০, ২০২৬, ০১:০৩ এএম

পবিত্র ঈদুল আজহা আসতে এখনো বেশ কিছু দিন বাকি। অথচ রাজধানীর পশুর হাটগুলোর জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলোতে এখনই শুরু হয়ে গেছে বাঁশ পোঁতা আর অবকাঠামো নির্মাণের কাজ।

নিয়ম অনুযায়ী, ইজারা চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের আগে হাটের প্রস্তুতি শুরু করার সুযোগ নেই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ- উভয় সিটি করপোরেশনেই ইজারার শর্ত ভঙ্গের এই প্রতিযোগিতা এখন দৃশ্যমান।

খেলার মাঠে গরুর হাটের থাবা : রাজধানীর তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট খেলার মাঠটি অত্র এলাকার শিশু-কিশোরদের জন্য ফুসফুসের মতো। প্রতিদিন বিকেলে এখানে শত শত কিশোর খেলাধুলায় মেতে ওঠে। কিন্তু এখন সেখানে খেলার বলের বদলে দেখা যাচ্ছে বাঁশের স্তূপ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এই মাঠটি হাটের জন্য ইজারা দিলেও এখনো সর্বোচ্চ দরদাতার সাথে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। অথচ মাঠটি এখনই হাটের ইজারাদারদের দখলে চলে গেছে।

একই চিত্র দেখা গেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আমুলিয়া এবং গ্রিন বনশ্রী হাউজিং এলাকায়। সেখানেও সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নাম আসার পরপরই প্রভাবশালীরা মাঠ ও আশপাশের সড়ক দখল করে হাটের প্যান্ডেল তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এতে করে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে এবং ছোট ছোট শিশুরা তাদের একমাত্র খেলার জায়গাটি হারিয়েছে।

ইজারা পরিস্থিতির পরিসংখ্যান : তথ্য অনুযায়ী, এবারের কোরবানির ঈদে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৫টি অস্থায়ী হাট বসার কথা রয়েছে। যার মধ্যে প্রথম দফার টেন্ডারে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭টি হাটের সর্বোচ্চ দরদাতা চূড়ান্ত হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১১টি অস্থায়ী হাটের মধ্যে আটটিতে সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া গেছে। বাকি হাটগুলোর টেন্ডার প্রক্রিয়া এখনো চলমান। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি হাটের আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই মাঠ দখল হয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ- ‘অনিয়মই যখন নিয়ম’ : নগরপরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা সিটি করপোরেশনের এই উদাসীনতাকে কঠোর সমালোচনা করছেন। নগরপরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘ঢাকা শহরে যেখানে খেলার মাঠের চরম সংকট, সেখানে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও সিটি করপোরেশন মাঠগুলোকে হাটের বাইরে রাখার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ইজারা চুক্তির অন্তত ১২ দিন আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করা মানে সরাসরি শর্ত ভঙ্গ করা। শিশুদের খেলার সুযোগ কেড়ে নেয়ার যে সামাজিক মূল্য, তা কি সিটি করপোরেশন বুঝবে?’

রাজধানীর সাধারণ নাগরিকরা বলছেন, অতীতে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান শাস্তি না হওয়ায় ইজারাদাররা এখন বেপরোয়া। তাদের কাছে নিয়ম ভঙ্গের বিষয়টিই এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

দুই সিটি প্রশাসকের হুঁশিয়ারি : হাটের আগাম দখল নিয়ে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসকরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছি যে, নির্দিষ্ট সময়ের আগে কোথাও কোনো হাট বসতে পারবে না। আমরা হাটের সীমানা টেনে দিচ্ছি। ইজারাদাররা যদি সেই সীমানার বাইরে যায় বা সময়ের আগে কাজ শুরু করে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা মূলত চার দিনের শর্ত দিয়ে হাটের ইজারা দেই। এছাড়া জনদুর্ভোগ ও যানজট সৃষ্টি না করা এবং হাটের বর্জ্য নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার করার মতো কঠোর শর্ত রয়েছে। এসব শর্তের সামান্যতম ব্যত্যয় ঘটলে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

সর্বোপরি, প্রতি বছরই পশুর হাটকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা এক বিশৃঙ্খল নগরীতে পরিণত হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবারই ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়, কিন্তু মাঠের চিত্র বদলায় না। এবারের ঈদে ইজারাদাররা আইনের প্রতি কতটুকু শ্রদ্ধাশীল থাকেন এবং সিটি করপোরেশন তাদের হুঁশিয়ারি কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারে, তা-ই এখন দেখার বিষয়। জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আসন্ন ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নিতে পারে নগরবাসীর জন্য।