ঢাকার সড়কে এআই বিপ্লব

মো. নেয়ামত উল্যাহ প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২৬, ১২:২৯ এএম

রাজধানী ঢাকার চিরচেনা যানজট আর বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের মান্ধাতা আমলের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কাটিয়ে এবার রাজপথে সক্রিয় হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা’।

আধুনিক এই ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার ফলে এখন থেকে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা নিয়ম ভেঙে পার পাওয়ার সুযোগ একপ্রকার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সার্জেন্টের বাঁশি বা হাতের ইশারার অপেক্ষা না করেই অত্যাধুনিক এই ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিটি যানবাহন।

ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত এই প্রকল্পে গাড়ির নম্বর প্লেট স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিআরটিএ’র ডাটাবেজ থেকে মালিকের তথ্য বের করে মামলার নোটিশ পৌঁছে যাচ্ছে মোবাইল ফোনে। আপাতত গুলশান ও বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এই ‘স্মার্ট মনিটরিং’ শুরু হলেও শিগগিরই এর আওতা পুরো শহরে ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ডিএমপি।

এই প্রযুক্তি যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে, তেমনি পুলিশের ওপর কাজের চাপ কমিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাকে করবে আন্তর্জাতিক মানের। তবে প্রযুক্তির এই সফলতাকে স্থায়ী করতে বিআরটিএ’র ডাটাবেজ হালনাগাদ ও সাধারণ চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার রাজপথে এআই-এর এই বিপ্লব যানজট নিরসন ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কতটা কার্যকর হয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

এআই ক্যামেরা যেভাবে করছে ডিজিটাল নজরদারি : রাজধানীর নির্ধারিত পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে বিশেষ হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা। এই ক্যামেরাগুলো কেবল ছবিই তুলছে না, বরং গাড়ির গতিবিধি বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। আইন লঙ্ঘন শনাক্তকরণ: যখনই কোনো গাড়ি লাল সংকেত অমান্য করছে, স্টপ লাইন অতিক্রম করছে বা উল্টো পথে চলছে, ক্যামেরাটি তাৎক্ষণিক সেই মুহূর্তেরভিডিও ও নম্বর প্লেটের ছবি ধারণ করে।

স্বয়ংক্রিয় মামলা: ধারণকৃত ডেটা সরাসরি ডিএমপির কন্ট্রোল রুমে চলে যায়। সেখান থেকে বিআরটিএ’র ডাটাবেজের সঙ্গে সমন্বয় করে গাড়ির মালিকের নাম ও ঠিকানায় ডিজিটাল পেমেন্ট স্লিপসহ মামলার নোটিশ চলে যাচ্ছে। পরিসংখ্যান: ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষামূলক চলাকালেই ২ হাজারের বেশি আইন লঙ্ঘনের দৃশ্য ধরা পড়েছে এবং ইতোমধ্যে ৪০০-এর বেশি মামলার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

১২০ পয়েন্টে পৌঁছাবে নজরদারি : ডিএমপি জানিয়েছে, বর্তমানে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ আটটি পয়েন্টে এই কার্যক্রম চলছে। তবে এটি কেবল শুরু। ১. আগামী ৬ মাস: প্রযুক্তির আওতা বাড়ানো হবে ৬০টি ব্যস্ততম স্পটে। ২. আগামী ১ বছর: রাজধানীর ১২০টি পয়েন্টে এআই ক্যামেরা বসানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গুলশান-২ মোড়ে দায়িত্বরত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, ‘প্রযুক্তি আসার পর চালকদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে শেষ রাতে বা ভোরে যখন রাস্তায় পুলিশ থাকে না, তখনও প্রায় ৬০ শতাংশ চালক এখন সিগন্যাল মেনে গাড়ি থামাচ্ছেন।’

মিশ্র প্রতিক্রিয়া, চালকদের আশা ও শঙ্কা : নতুন এই পদ্ধতি নিয়ে চালক ও মালিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। ইতিবাচক দিক: মোটরসাইকেল চালক শফিকুল ইসলামের মতে, পুলিশ থাকুক বা না থাকুক, ক্যামেরা আমাদের দেখছে এই ভয়টা থাকলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে।

শঙ্কার জায়গা: অনেক প্রাইভেটকার চালক প্রশ্ন তুলেছেন বিআরটিএ’র ডাটাবেজ নিয়ে। যদি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নিরপরাধ কেউ মামলার শিকার হন, তবে সেই ভোগান্তি কে মেটাবে? বাস চালকদের দাবি, অনেক সময় যানজটের চাপে পড়ে সিগন্যাল ডিঙাতে হয়, ডিজিটাল পদ্ধতিতে এসব মানবিক দিক বিবেচনার সুযোগ নেই।

বিশেষজ্ঞ মতামত- কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী চ্যালেঞ্জ : প্রযুক্তির ব্যবহারকে স্বাগত জানালেও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা কিছু মৌলিক সমস্যার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘মূল সড়কে যখন রিকশা বা ধীরগতির যান থাকে, তখন এআই ক্যামেরা কতটা সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারবে তা বড় চ্যালেঞ্জ।

এছাড়া বাংলাদেশে ভুয়া নম্বর প্লেট বা একই নম্বরে একাধিক গাড়ি চলার সমস্যা রয়েছে। বিআরটিএ সার্ভারের সক্ষমতা না বাড়ালে এর সুফল মিলবে না।’

অন্যদিকে অধ্যাপক ড. শামসুল হক মনে করেন প্রচারণার অভাবের কথা। তার মতে, দেশের অনেক চালক এখনো এই সিস্টেম সম্পর্কে অবগতই নন। উন্নত দেশের মতো সুফল পেতে হলে ব্যবস্থাপনাকে আগে পেশাদার করতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা’র অন্তর্ভুক্তি কেবল সময়ের দাবিই ছিল না, বরং এটি একটি আধুনিক ও স্মার্ট রাজধানী গড়ার পথে অপরিহার্য পদক্ষেপ।

প্রযুক্তির এই ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের হার কমবে, অন্যদিকে পুলিশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে। তবে ডিজিটাল এই নজরদারির সুফল দীর্ঘমেয়াদে পেতে হলে কেবল প্রযুক্তি বসানোই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি বিআরটিএ’র ডাটাবেজ নিখুঁতভাবে হালনাগাদ করা, ভুয়া নম্বর প্লেট বন্ধ করা এবং চালকদের পেশাদার প্রশিক্ষণ দেয়া অত্যন্ত জরুরি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই বিপ্লব যেন কেবল মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির হাতিয়ার না হয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত ও যানজটমুক্ত ঢাকা গড়ার প্রকৃত মাধ্যম হয়ে ওঠে, সেটিই এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা। প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ আর নাগরিক সচেতনতার মেলবন্ধনই পারে ঢাকার রাজপথকে আধুনিক ও সুশৃঙ্খল এক রূপ দিতে।