দুর্বল হচ্ছে দেশের শ্রমবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ১২:৩৪ এএম

বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে দেশের সামগ্রিক শ্রমবাজার মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা, ব্যাংকিং খাতের মূলধন সংকট এবং রাজস্ব আদায়ের ঐতিহাসিক দুর্বলতার কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

গতকাল সোমবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক একটি সেমিনারে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থার মতে, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কেবল ২০২৫ সালেই দেশের প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের সীমার নিচে চলে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হচ্ছে। মূল সূচকগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান দেয়া হলো— সম্ভাব্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯%            চলতি অর্থবছরের প্রাক্কলিত হিসাব। গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৫% ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ের হিসাব (২০২২ থেকে ঊর্ধ্বমুখী)। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬.০% ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (আগের অর্থবছরের জানুয়ারিতে ছিল ৬.৮%)। কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৯% ২০২৫ অর্থবছরে যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৯.৫% ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই হার ছিল ৩৭.৬%।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামোর সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে বেকারত্ব ও ছদ্ম-বেকারত্ব বাড়ছে, যা সরাসরি শ্রমবাজারকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচির ওপর। সংস্থাটির তথ্যমতে, কর্মসংস্থানের অভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে।

২০২২ সালের পর থেকে দেশে মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক মনে করে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর পেছনে প্রধান চারটি কারণ চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি— ১. উচ্চ পরিবহন ব্যয়: অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ। ২. আমদানি ও বাজারজাতকরণ খরচ: ডলার সংকট এবং আমদানি পণ্যের চড়া মূল্য। ৩. মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: সরবরাহ শৃঙ্খলে (সাপ্লাই চেইন) অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ। ৪. জালানি ব্যয় বৃদ্ধি: বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া।

দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, গত ৩৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কমেছে। এর মূল কারণ হিসেবে সরকারি খাতের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণকে দায়ী করেছে বিশ্বব্যাংক। সরকার তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ায় বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ২২টি ব্যাংক ভয়াবহ মূলধন ঘাটতিতে ভুগছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই ২২টি ব্যাংকের হাতেই পুরো ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের ৪৭ শতাংশ রয়েছে। ফলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বা রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.৯ শতাংশে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে ২০২৬ অর্থবছরে এটি সামান্য বাড়তে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।

রাজস্ব কম হওয়ায় সরকারকে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৭.৬ শতাংশ থাকলেও তা দ্রুত বেড়ে ৩৯.৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক ও পিআরআই-এর এই যৌথ প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি কখনো টেকসই হতে পারে না, যার প্রমাণ ১৪ লাখ মানুষের নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া। ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি দূর করা, বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ছাড়া এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি দ্রুত কর্মসংস্থান বান্ধব বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ না করে এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে আগামী দিনগুলোতে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ আরও তীব্র হতে পারে।