মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনাকর মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতি টানতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন ও অত্যন্ত কঠোর শর্তসংবলিত শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইরান। তবে তেহরানের এই প্রস্তাব নিয়ে ওয়াশিংটনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত শীতল।
একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা চলছে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইঙ্গিতবাহী মন্তব্যে সামরিক হামলার আতঙ্কও কাটছে না। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই শান্তি প্রস্তাবের বিষয়বস্তু প্রকাশ করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে উত্থাপিত এই শান্তি প্রস্তাবে কয়েকটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মেনে নেয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। উপপররাষ্ট্র মন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি শর্তগুলো ব্যাখ্যা করে জানান— যুগপৎ যুদ্ধবিরতি: লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে কোনো সময়ক্ষেপণ ছাড়াই স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। সৈন্য প্রত্যাহার: ইরানের সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সকল সেনাসদস্যকে অবিলম্বে পুরোপুরি সরিয়ে নিতে হবে।
ক্ষতিপূরণ প্রদান: চলমান যুদ্ধের কারণে ইরানসহ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের ফলে যে ভয়াবহ অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর আরোপিত সমস্ত ধরনের মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বিনা শর্তে তুলে নিতে হবে। সম্পদ অবমুক্তকরণ: বিভিন্ন দেশে জব্দ করে রাখা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অবমুক্ত করতে হবে।
নৌ-অবরোধ তুলে নেয়া: পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনী কর্তৃক আরোপিত নৌ-অবরোধ বা অবরোধমূলক অবস্থান প্রত্যাহার করতে হবে। ইরানের এই শান্তি প্রস্তাবের ভাষা ও বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এর আগের প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে বড় কোনো মৌলিক পরিবর্তন নেই। পূর্বে ইরান কর্তৃক প্রেরিত একটি শান্তি প্রস্তাবকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ‘আবর্জনা’ বা তুচ্ছজ্ঞান করে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রস্তাবও মার্কিন প্রশাসনের কাছে তেমন কোনো নতুন চমক নিয়ে আসেনি। ফলে ওয়াশিংটন এই নতুন শর্তগুলোকে গুরুত্ব দেবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার গভীর রাতে তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করেন।
তিনি দাবি করেন যে, গতকাল মঙ্গলবার ইরানে এক বড় ধরনের সামরিক হামলা পরিচালনার সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত ছিল। তবে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত অনুরোধ ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতার খাতিরে তিনি শেষ মুহূর্তে হামলাটি স্থগিত করেছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য একদিকে যেমন যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে নতুন করে একটি ‘চুক্তি’ বা আলোচনার ক্ষীণ আশার ইঙ্গিতও দিচ্ছে। ইরানের এই প্রস্তাবটি তন দফা আন্দোলন থেকে তারা পিছু হটবেন না।
প্রাথমিক সড়ক অবরোধের পর শুক্রবারও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকে। এরপর আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় শনিবার। লাল কার্ড ও তালাবদ্ধ কর্মসূচি: শনিবার শিক্ষার্থীরা নতুন ভিসি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটে সম্পূর্ণ ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন।
তারা ‘লাল কার্ড কর্মসূচি’র ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকে বড় বড় তালা ঝুলিয়ে দেন। রোববারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখা যায় গত রোববার। ওই দিন ভিসি নিয়োগের পক্ষ ও বিপক্ষ এবং শিক্ষার্থীদের দুটি রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে দিনভর দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এই সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য এবং সাধারণ শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৫ জন গুরুতর আহত হন, যাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি হলো ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে কোনো বহিরাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে নয়, বরং ডুয়েটেরই কোনো যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ অভ্যন্তরীণ শিক্ষককে নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রধান ৩টি দাবি হলো— ১. শাবিপ্রবির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালের উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। ২. ডুয়েটের নিজস্ব শিক্ষা কাঠামো ও পরিবেশ বোঝেন- এমন কোনো অভ্যন্তরীণ শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। ৩. আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং কোনো শিক্ষার্থীকে হয়রানি করা চলবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অচল অবস্থার পেছনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক উসকানি রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদল। ডুয়েট শাখা ছাত্রদলের একাধিক নেতার দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক আবেগকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ বা উগ্রপন্থি সংগঠন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে।
ছাত্রদলের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো প্রকৃত সম্পৃক্ততা নেই; বরং একটি বিশেষ গোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করতে মোটরসাইকেল পোড়ানো এবং আসবাবপত্র ভাঙচুরের মতো সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই রাজনৈতিক ট্যাগিংয়ের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি সম্পূর্ণ সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াই এবং এর সাথে কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডার সম্পর্ক নেই।
একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান টানা ছয় দিন ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা বজায় থাকা দেশের শিক্ষা খাতের জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়। ডুয়েটের নিজস্ব শিক্ষককে ভিসি করার দাবিটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের লড়াকু আবেগ ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার সাথে মিশে আছে।
তবে দাবি আদায়ের নামে ক্যাম্পাসে সহিংসতা, মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করার মতো কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে, ২৫০ জন অজ্ঞাতনামা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা দিয়ে ক্যাম্পাসকে পুলিশি আতঙ্কের নগরীতে পরিণত করাও সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান আনবে না।
এই অচলাবস্থা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অনতিবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জরুরি উচ্চপর্যায়ের সংলাপের আয়োজন করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করে এবং ডুয়েটের বিশেষায়িত কাঠামোর কথা মাথায় রেখে একটি গ্রহণযোগ্য ও দক্ষ অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব তৈরি করার মাধ্যমেই কেবল ডুয়েটের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।