শিশুদের ওপর বর্বরতা বন্ধ হোক

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মে ২৪, ২০২৬, ১২:১৭ এএম

বাংলাদেশে শিশুদের ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। সমপ্রতি সংঘটিত বেশ কিছু নির্মম ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের পক্ষ থেকে এক জরুরি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘শিশুদের ওপর এই বর্বরতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।’

বিবৃতিতে ইউনিসেফ জানায়, সমপ্রতি বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর যে হারে নৃশংস সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যে স্থানগুলোকে শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হতো- যেমন ঘর, স্কুল বা শিশুযত্ন কেন্দ্র, সেই জায়গাগুলোতেই তারা আজ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো জঘন্য ঘটনা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ইউনিসেফ ভুক্তভোগী সব পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে এবং এই অন্যায়ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

ইউনিসেফের মতে, বাংলাদেশে শিশু ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (জিবিভি) রোধে প্রতিরোধব্যবস্থা আরও জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, অপরাধীদের বিচার না হওয়া বা তাদের ‘পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি’ এই ধরনের অপরাধ বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এই দায়মুক্তি থেকে সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সহিংসতা রোধে ইউনিসেফ যে সুপারিশগুলো সামনে এনেছে গেলো হলো— প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ও জবাবদিহি: স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র এবং পাড়া-মহল্লায় জবাবদিহির জায়গা আরও সুদৃঢ় করতে হবে। বিচার ও সেবা ব্যবস্থা: শিশুবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা এবং দক্ষ বিচার বিভাগ নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক সেবা: নির্যাতনের শিকার শিশুদের জন্য মানসিক সহায়তার পরিধি বাড়াতে হবে। সহায়তা লাইন: যে কোনো ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং তাৎক্ষণিক সহায়তা পেতে জাতীয় চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ যোগাযোগ করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

ইউনিসেফ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রতি একটি জরুরি বার্তা দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা এক ধরনের নতুন নির্যাতন। এটি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের মানসিক কষ্ট কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই প্রতিটি নাগরিককে ভুক্তভোগীর অধিকার ও সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইউনিসেফ জোর দিয়ে বলছে, ‘সমাজে নীরবতা বজায় থাকলে সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ে।’

তারা শিশু, নারী, পরিবার এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে যে কোনো সহিংসতার বিরুদ্ধে সাহসী ভূমিকা নিতে আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিটি শিশুর সব জায়গায় স্কুলে, পরিবারে এবং গণমাধ্যমেও সুরক্ষা পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সবাইকে সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হতে হবে।

শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, বরং একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। ইউনিসেফের এই কড়া বার্তা এবং আহ্বান কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি এক জোরালো হুঁশিয়ারি। অপরাধীদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি শিশুবান্ধব ও নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা, আইনি কঠোরতা এবং সামাজিক জবাবদিহিই পারে শিশুদের জন্য একটি ভীতিহীন পৃথিবী উপহার দিতে। আসুন, শিশুদের ওপর এই বর্বরতা রোধে আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার হই।