উপদেষ্টা মাহফুজ আলম

রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাতের জন্য মুখিয়ে রয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক  প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৫, ০৯:৪৬ পিএম

তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো সংঘাতের জন্য মুখিয়ে রয়েছে। তবে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থানের কারণে এখন পর্যন্ত তারা সরাসরি সংঘাতে জড়াচ্ছে না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিএমএ ভবনে ‘মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে মাহফুজ আলম এসব কথা বলেন। সংলাপের আয়োজন করে সুফি সম্প্রদায় নিয়ে গবেষণা করা প্ল্যাটফর্ম ‘মাকাম’।

মাহফুজ আলম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সংযম ও সংলাপের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলেই এখনো বড় ধরনের সংঘাতে যায়নি রাজনৈতিক দলগুলো। প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান না থাকলে হয়তো এখনই বড় সংঘাত শুরু হয়ে যেত,বলেন তিনি।

তথ্য উপদেষ্টা অভিযোগ করে বলেন, রাজনীতিতে এখন আর নীতি বা আদর্শ নয়, ক্ষমতাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন এক মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প ভাবনা নেই। এটা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক,তিনি যোগ করেন।

সংলাপে মাহফুজ আলম আরও বলেন, আওয়ামী লীগ এখন দেশের বিভিন্ন দরবার ও মাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে বলে তিনি শুনেছেন। উদ্দেশ্য, ধর্মীয় পরিমণ্ডলে এমন বার্তা ছড়ানো— যেন বর্তমান সরকার বা অন্তর্বর্তী প্রশাসন মাজার ভেঙে দিচ্ছে কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুমকির মুখে ফেলছে।

এই অভিযোগ বা ভয় দেখানোর প্রবণতা নতুন নয়, বলেন মাহফুজ আলম। গত ৫০ বছর ধরে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ কমিটি থেকে শুরু করে ইসলামী ফাউন্ডেশনের পরিচালনা বোর্ড পর্যন্ত পাল্টে গেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এখন একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।

তিনি সতর্ক করেন, ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে যদি রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হয়, তাহলে রাষ্ট্র আরও বিভাজিত হবে। ধর্মকে রাজনীতির অস্ত্র বানানো মানে সমাজে নতুন বিভাজন তৈরি করা,বলেন তিনি।

তথ্য উপদেষ্টা মনে করেন, আগের সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ চললেও সামাজিক পরিসরে এখনও সেই সংস্কৃতি টিকে আছে। রাষ্ট্রের ওপরের কাঠামো পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু নিচের স্তরের মানসিকতা বদলায়নি। সামাজিক ফ্যাসিবাদ এখনো সক্রিয়,মন্তব্য করেন মাহফুজ আলম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান হলেও, তাদের মধ্যে নানা তরিকা ও মতবাদে বিভাজন আছে। এই বিভাজনের মধ্যেই রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। কেউ কওমিদের সঙ্গে, কেউ সুন্নিদের সঙ্গে—এভাবে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় ধারাগুলোকে ভাগ করে নিয়েছে। এর ফলেই ধর্মীয় সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া দুর্বল হয়েছে, তিনি বলেন।

মাহফুজ আলম বলেন, গত ১৫ বছরে সুফি ঘরানার অনুসারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটি পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সুফিরা ভেবেছিল আওয়ামী লীগ তাঁদের সুরক্ষা দেবে, আর আওয়ামী লীগ ভেবেছিল সুফিরা ভোটের সময় পাশে থাকবে। এই সমঝোতার মধ্যেই ধর্মীয় রাজনীতি আটকে গেছে,বলেন তিনি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, কওমি আলেমদের অবস্থাও একই— তাঁরাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়েছেন। ধর্মীয় নেতৃত্বকে রাজনীতির বলি বানানো এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

দেশের ধর্মীয় রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তথ্য উপদেষ্টা। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশে থাকা বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোর মধ্যে কেউ কেউ চান মাজার সংস্কৃতি বিলুপ্ত হোক। এদের উদ্দেশ্য আদর্শিক ও রাজনৈতিক—যাতে বাংলাদেশে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ধারার প্রভাব বাড়ে।

তাঁর মতে, এসব প্রভাব মোকাবিলা করতে হলে রাষ্ট্রীয় ও নীতিগত স্তরে পরিকল্পনা নিতে হবে। ধর্মীয় জনগোষ্ঠী লড়াই করবে, মব করবে—এমন ভয় পেলে চলবে না। রাষ্ট্রকে এই সংকটকে রাজনৈতিক ও নীতিগত জায়গা থেকে মোকাবিলা করতে হবে,বলেন মাহফুজ আলম।

এক বছরে উল্লেখযোগ্য সংস্কার না হওয়ায় সমাজে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এ কথা স্বীকার করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, এই ক্ষোভ যদি পাল্টা আঘাতে পরিণত হয়, তাহলে তা আরও বিপজ্জনক হবে।”

তিনি জানান, সম্প্রতি কয়েকটি মাজারে হামলার ঘটনায় বহুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এবং সরকার এখন ক্ষতিগ্রস্ত মাজারগুলোর সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে।

মাজার কর্তৃপক্ষকে মামলা করার আহ্বান জানিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, এই সংস্কৃতি যদি টিকে যায়, তাহলে এক দলের ইসলাম অন্য দলের ইসলামকে ধ্বংস করবে। আজ সুফিদের ওপর হামলা হচ্ছে, কাল কওমিদের ওপর হবে—এটা অব্যাহত থাকতে পারে না।

সংলাপের আহ্বান জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজে ধর্মীয় ধারাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও বোঝাপড়া তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। সংঘাত নয়, সংলাপই হতে পারে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ, বলেন তিনি।

সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন গবেষক, ধর্মীয় বিশ্লেষক ও বিভিন্ন তরিকার প্রতিনিধিরা। তারা বলেন, মাজার সংস্কৃতি শুধু ধর্মীয় নয়, এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এই সংস্কৃতিকে সহিংসতা ও সংকীর্ণতার বাইরে রেখে সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পুনর্গঠনের দাবি জানান তারা।

অনুষ্ঠানের শেষে এক সাংবাদিক তথ্য উপদেষ্টাকে তার পদত্যাগ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে তিনি তা উত্তর না দিয়ে বলেন, আজকের আলোচনা ছিল ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক সংকট নিয়ে—রাজনৈতিক পদ নিয়ে নয়।

 

ইএইচ