স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: নভেম্বর ২, ২০২৫, ১০:৫৪ পিএম

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্বচ্ছতা ও পেশাদার মানদণ্ড নিশ্চিতের লক্ষ্যে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের পর অধ্যাদেশটি কার্যকর হলে এটি বাংলাদেশের পুলিশ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের সূত্র জানিয়েছে, খসড়াটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো হবে অনুমোদনের জন্য।

এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে চলতি বছরের জুলাই সনদের আলোকে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছিল পুলিশ ব্যবস্থার সংস্কার, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায়।

খসড়া অনুযায়ী, একজন অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তার সঙ্গে থাকবেন একাধিক সদস্য যাদের মধ্যে থাকবেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ, সাবেক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অথবা অতিরিক্ত আইজিপি), পুলিশ একাডেমির সাবেক অধ্যক্ষ, আইন বা অপরাধতত্ত্বের অধ্যাপক এবং অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন মানবাধিকারকর্মী।

কমিশনের চেয়ারম্যানের মর্যাদা হবে আপিল বিভাগের বিচারপতির সমান, আর সদস্যদের মর্যাদা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতির সমান। তারা চার বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন তবে পুনর্নিয়োগের সুযোগ থাকবে না।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা বা সুপারিশ তিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি কোনো বাধা থাকে, কর্তৃপক্ষকে একই সময়ের মধ্যে কমিশনকে তা জানাতে হবে। এতে কমিশন পুনর্বিবেচনা করে নতুন নির্দেশ দিতে পারবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারা কার্যকর হলে পুলিশ প্রশাসনের ওপর নির্বাহী কর্তৃত্বের অপব্যবহার অনেকাংশে কমবে।

কমিশন গঠনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে সাত সদস্যের নির্বাচন কমিটি, যেখানে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত একজন বিচারপতি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান, সরকার ও বিরোধী দলের প্রতিনিধি এবং আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ নাগরিক প্রতিনিধি।

এই নির্বাচন প্রক্রিয়া ৩০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে, এবং কমপক্ষে পাঁচ সদস্য উপস্থিত থাকলে কোরাম পূর্ণ হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ আছে।

খসড়া অধ্যাদেশে কমিশনের দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা তদারক, পুলিশ সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তি, ও পুলিশ প্রধান নিয়োগের নির্দেশিকা প্রণয়ন।

এছাড়া কমিশন বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, যেখানে থাকবে পুলিশ সংস্কারের অগ্রগতি ও জনবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ।

আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল খসড়া প্রস্তুত কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ অধ্যাদেশ কার্যকর হলে পুলিশের স্বাধীনতা যেমন বাড়বে, তেমনি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে উঠবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আলী রীয়াজ বলেন, এটি জুলাই সনদের অন্যতম বড় অর্জন। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন হলে নাগরিক অধিকার রক্ষায় বড় পরিবর্তন আসবে।
পুলিশ সংস্কার ছিল ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের অন্যতম মূল অঙ্গীকার। তখনই সিদ্ধান্ত হয় পুলিশ প্রশাসনকে স্বচ্ছ, পেশাদার ও নাগরিকবান্ধব করতে একটি স্বাধীন কমিশন গঠিত হবে, যা ভবিষ্যতে কোনো সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে না।

অধ্যাদেশটি অনুমোদন পেলে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, যা শুধু প্রশাসনিক সংস্কার নয় গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারেরও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইএইচ